যৌথ স্বপ্ন হোক আমাদের
-ফরিদা রনি-
কিছুদিন আগে পে-অর্ডার করার জন্য গিয়েছিলাম একটি সরকারি ব্যাংকে। দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংক Pic-5কর্মকর্তার কাছে তার সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এসময় একজন বয়স্ক লোক এসে সেখানে দাঁড়ালেন। তারপর খুব তড়িঘড়ি করে একটি চেক বই ও একশত টাকার নোট সেই কর্মকর্তার হাতে গুঁজে দিলেন। ব্যাংক কর্মকর্তা ক্ষণিকের জন্য ইতস্তত বোধ করে ত্যালত্যালা হাসি দিয়ে নোটটি প্যান্টের পকেটে ভরে নিলেন। এ কান্ড দেখে আমার ভীষণ অস্বস্তি বোধ হলো। মনে হলো, আমিও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলাম। আমরা দূর্ণীতি ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেই। মাত্র একশত টাকা! শ্রেণী, পর্যায়ভেদে ঘুষের পরিমাণ ৫/১০ টাকা থেকে শুরু করে কোটির ঘর পেরিয়ে যায় এ নির্মম সত্য আমাদের সবারি জানা আছে। এভাবে কখনো অর্থ, কখনো সুবিধার বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যায় আমাদের আত্মা। দূর্নীতি সর্বগ্রাসী। দূর্ণীতির সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে অন্যায়বোধ আর কাজ করেনা। বিবককে পীড়া দেয়না। আমাদের অবস্থাও সেরকমই হয়ে গেছে।
দূর্ণীতির প্রতি আমাদের ঘৃণা নেই। বরং প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট অপরাধ আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। অনেকেই হয়তো এখন হাসবেন। হেসে বলবেন, ছোট নয়, আমরা সব বড় ধরণের দূর্ণীতিতে অভ্যস্ত। আমরা ছোট দূণীতি করি এবং মেনে নেই বলে আমাদের সহ্য সীমা এতটা পোক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ দূর্ণীতিগ্রস্থ দেশের তালিকার শীর্ষ দশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার অর্থ এ নয়যে বাংলাদেশে দূর্ণীতি কমেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দিতে হয় ডোনেশন, পেনশনের টাকা উত্তোলনের জন্য কয়েক টেবিলের কর্মকর্তাকে উপযুক্ত পরিমাণ টাকা দিয়ে খুশি করতে হয়। এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার পাওয়ার জন্য ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলকে বিরাট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। আয়কর ফাঁকি দেয়ার জন্য আয়কর উকিলকে টাকা দিয়ে বুঝাতে হয়। কৃষির ভিত তৈরি করছেন যারা, তাদেরকে প্রান্তিক ও অচ্ছুত বানিয়ে রাখা হয়েছে যুগের পর যুগ। তারা কখনো উন্নয়নের অংশিদার হতে পারেনা। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা যথাসময়ে পর্যাপ্ত বীজ, সার ও ডিজেল পায়না। সেখানেও থাকে রাজনৈতিক প্রভাব। মতা যার, বীজ-সারও তার।
একপক্ষ ভাবছি, আমরা দরিদ্র্য, বঞ্চনা আর নিপীড়ণ আমাদের নিয়তি। এর থেকে মুক্তি নেই। আরেকপ সুবিধাভোগী। তাদের মনোভাব যা পারো বুঝে নাও, কেড়ে নাও। ড. আতিউর রহমান চমৎকার অভিমত দিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধভাবে দারিদ্র্যর ভূত আমাদের কাঁধ থেকে নামাতে হবে। গরিব গরিব করতে করতে আমরা মনটাকেও গরিব করে ফেলেছি। আত্মনির্ভর হতে হলে আমরাও পারি এমন একটা বিশ্বাস থাকতে হবে (আলো আঁধারের বাংলাদেশ, মানব উন্নয়নের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ)। আমাদের আছে অনেক কিছু। শুধু এর সঠিক ব্যবহার জানা নেই। তাগিদ ও তাড়নার অভাবে কোন অর্জন ধরা দেয়না সহজে। পুলিশি প্রহরা দিয়ে দূর্ণীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। দূর্ণতি প্রতিরোধে প্রয়োজন Pic-6আত্মসচেতনতা। প্রকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের অবদান ও মেধাকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে
উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। তরুনদের সৃষ্টিশীলতা ও মেধার সাথে প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে সমন্বয় করতে হবে। মনের প্রয়োজন সংস্কার আর সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য দরকার সম্পর্কের চর্চা। কিন্তু সংস্কার ও চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ প্রক্রিয়া অনুপস্থিত। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের পাশ করতে সাহায্য করে। কিন্তু মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং  দেশপ্রেম সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা।
এমন বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে সব শ্রেণী, পেশার মানুষ কাজ করে খেতে পারবে। তাকে কোন দলীয়করণ, প্রভাবশালীদের মতার বলয়ে আটকে থাকতে হবেনা। সুযোগ-সুবিধা শহর কেন্দ্রিক হবেনা। প্রযুক্তির ব্যবহার পৌঁছে যাবে গ্রাম, পল্লী, মহল্লা ও চরাঞ্চলে। প্রত্যেক ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত একইমানের ও পদ্ধতির শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে।  অর্থনৈতিকভাবে সুদৃঢ় অবস্থানে পৌঁছাতে না পারলে জাতিগত স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব হবেনা। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রকে নিতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। রাষ্ট্র ও রাজনীতি পারে দেশকে বদলাতে।
আমাদের পথ চলা ব্যর্থতার ইতিহাসে পরিপূর্ণ নয়। এ পথ চলায় অনেক সফলতাও আমাদের আছে। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। এ দেশের বেশিরভাগ স্কুল গমনোপযোগী শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ দুর্ণতিগ্রস্থ দেশের তালিকার শীর্ষ দশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ধারাবাহিক জয়, আন্তর্জাতিক গণিত উৎসবে বাংলাদেশের তরুণদের ভালো ফলাফল, আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে চলার মনোবলকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুন। পিছুহটা বাঙালির বৈশিষ্ট্য নয়। বাঙালি জানে কিভাবে ধ্বংসস্তুপ থেকে জেগে উঠতে হয়। তাই প্রতিবছর বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের আঘাত তাদের পরাজিত করতে পারেনা। সুকান্ত ভট্রাচার্য্যর কবিতায় তাই বেজে ওঠে, বাংলাদেশে জ্বলেপুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়। আমাদের অর্জন কম নয়। হয়তো আমাদের এগিয়ে চলার গতি কিছুটা ধীর। রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার থাকলে দেশকে উন্নয়নের পথে চালনা করা অসম্ভব কিছু নয়। জনগণ তাকিয়ে থাকে যোগ্য নেতৃত্বের দিকে।
আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। দেশের শ্রমজীবী, খেটে-খাওয়া সাধারন মানুষের অনেক কিছু করার সামর্থ্য থাকলেও রাজনেতিক দ্বন্ধ সংঘাতে তাদের পিছিয়ে পড়তে হয়। নিজের অর্জনকে হারাতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে ফায়দা লুটে নেয় অনেকে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সব শ্রেণী, পেশার মানুষদের মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কোন সরকার দিতে পারছেনা। কতিপয় লোকের কাছে সম্পদ কেন্দ্রীভ‚ত হচ্ছে। ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন ঘটছেনা। মফস্বল ও গ্রাম থেকে মানুষ কাজের জন্য জীবীকার তাগিদে শহরে ভিড় জমাচ্ছে। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি।
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে চলে দলীয় টানাপড়েন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেনা। নতুন প্রজন্ম ক্রমস চেতনা ধারন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। চেতনা শুধুমাত্র আড়ম্বরপূর্ণ দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চেতনার বিকাশ হয় দেশপ্রেম, দেশ ও মানুষের প্রতি দায়বোধ, সামাজিক জীবনযাপনে শৃঙ্খলা মেনে চলা, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মতো ব্যাপক দায়িত্বে পালনের মধ্য দিয়ে। তাহলেই সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।  
ফিরে যাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে, তাঁর উদ্ধৃতি, ‘আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজেদের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা’ (রবীন্দ্র রচনাবলী)। আমরা জেগে উঠতে চাই। বাংলাদেশকে সমৃদ্ধি দিয়ে ভরে তুলতে বাংলার প্রতিটি মানুষের সামর্থকে কাজে লাগাতে চাই। স্বপ্নের সাথে স্বপ্নের যোগ চাই। বিচ্ছিন্ন স্বপ্ন স্বার্থপরতা তৈরি করে। যৌথ স্বপ্ন এগিয়ে নেয়, সফল করে প্রচেষ্টা।
  pic-2
  
বিশেষ প্রতিবেদন