সাংবাদিকতা কি পেশা না নেশা ?
11
-তন্ময় মজুমদার-
প্রশ্নটি অনেকের মত আমাকেও ভাবায়। বস্তুত সাংবাদিকতা একটি সর্বজন স্বীকৃত সেবাধর্মী পেশা। বর্তমানে এর ব্যপকতা পেশাটির পটভূমিকে অনেক বেশি উজ্জ্বল করেছে আজ পৃথিবীর কাছে। অথচ এ পেশার অন্তর্নিহিত সমস্যাসমূহ অপ্রকাশিত সাংবাদিকদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাঠকদের কাছেই। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের অধিকাংশ সাংবাদিক এ পেশায় কাজ করে শুধুমাত্র বিবেকের নেশার কারণেই।
যেমন, অনেক কষ্টের স্বীকার হয়েও একজন প্রতিবেদককে তাঁর কর্তব্যে অনড় দেখা যায়। বৃষ্টির বজ্রপাত, রোদের ক্ষরতাপ, রাস্তার ঝাঁকুনি, পেটের খিদে, সন্ত্রাসীদের হুমকি, মামলার ধম্কি, করপোরেট কন্ট্রোল, নিউজ ফিল্টার ইত্যাদি সাংবাদিকদের নিত্য সঙ্গী। এরপরও রয়েছে সঠিক পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার যন্ত্রনা বা বেতন না পাওয়াসহ অন্তত ১০০ টি অনিশ্চয়তা। তাহলে সাংবাদিক লিখে কেন? ভালোবেসে লিখে কাগজে-কলমে। প্রতিটি সকালে জাতির বিবেক হয়ে আমাদের জাগায় এ এক অন্যরকম নেশায়।
জেমস অগাস্ট হিকি ও রাজা রাম মোহন রায় থেকে উপমহাদেশের গণমাধ্যম সাধারণ মানুষের কথা বললেও, আজ তা বিত্তবানদেরই অভিবাদন জানাচ্ছে প্রতিটি পরিবেশনায়। যেমনটি একজন কনগ্লোমারেটস মিডিয়াকে ব্যবহার করে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে। মিডিয়া মালিককে অন্য ব্যবসায়ীরা ভয়ও পায় বটে। বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য সুবিধা দিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখতে চায়। রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ অনেক সুবিধা এই শ্রেণীর মালিকরা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে খুব সহজেই পেয়ে যায়। আর বেশি সমস্যা হলে, ৮৫ মাস বেতন বাকি থাকার পরও মিডিয়ার ক্ষেত্রে বন্ধ করে দেয়ার উদাহরণ তো রয়েছেই। কারণ, গণমাধ্যম শ্রমিকদের ধৈর্য শক্তি বেশি বলে তারা হয়তো নিরুপায়।
এইসব ত্যাগে কতোটা নিস্কন্টক আবেগ থাকলেই এই পেশায় কাজ করা সম্ভব? তাই আমার ভাষায় সাংবাদিকতা একটি নেশা। চাইলেই তেমনি এই পেশাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া যায় না সহজেই।
এ পেশার মহানুভবতায় একটি কলম, কালির মতোই স্বাধীন হয়। তাই সাংবাদিককে দায়িত্ব রাখতে হয় অনেক বেশি। তথ্য প্রমান ছাড়া পরিবেশিত ভুল সংবাদ যেকোন অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর ও মর্যাদাহানিকর। কারণ প্রত্যেক মানুষকে ঘিরে তার রয়েছে একটি সমাজ। একজন অভিযুক্তের ছাপানো ছবি, তার মা-বাবা-ভাই-বোনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে সমাজে। যদিও অপরাধীর অপরাধের সাথে আত্মীয়-স্বজনের সংশ্লিষ্টতা থাকে না। তবুও তারা সমাজের রোষানলের স্বীকার হয়।
অন্যদিকে, প্রতিবেদকের সারাদিনের সকল ত্যাগের বিনিময়ে প্রকাশিত সংবাদ হলো একমাত্র অক্সিজেন, যা তাকে দ্বিতীয়দিনের সংবাদ পরিবেশনে আনন্দ দেয় ও এ পেশায় নিজেকে বাচঁতে উৎসাহিত করে।      
পেশা বা নেশার বির্তকে আর না গিয়ে ’চলমান নোয়াখালী’র ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এইদিনে গোটা সাংবাদিক সমাজ ও মালিকপক্ষের কাছে প্রত্যাশা রইলো আলোকিত গণমাধ্যমের। যাতে করে সময়ের সাড়া জাগানো গণমাধ্যম ’লেপ ডগ’ বা কোলের প্রহরী থেকে ’ওয়াচ ডগ’ বা স্বতন্ত্র প্রহরী হতে পারে। তবেই প্রগতির জোয়ারে ভাসবে গোটা বাংলাদেশ।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tanmoymz@gmail.com