
-ফরিদা রনি-
নোয়াখালী নামে কেনোশহর নেই। একসময় ছিল। সে শহরটা কেমন ছিল আমার খুব জানতে
ইচ্ছে করে। নদী আমাদের কাছ থেকে শহর কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন কখনো
দূর্যোগ মানেনা। তাই আরেক জায়গায় নতুন করে মানুষ শহর গড়ে নিয়েছে। সেই
শহরটির নাম মাইজদী কোর্ট।যে মাটিতে জন্ম হয়, যেখানে অনেক যাচিত অভিজ্ঞতা, আনন্দ-বেদনার মূহুর্তকে সাক্ষী করে মানুষ বেড়ে ওঠে সে জায়গাটি সবার কাছে পরম প্রিয়। নোয়াখালী আমার কাছে তেমনি একটি প্রিয় জায়গা। বিশেষ করে মাইজদী শহর। আমার জন্ম এ জেলায় না হলেও আমার বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবনের পুরো সময়টার পরতেই আছে মাইজদী শহরের পরশ। এ শহর আমাকে সবসময় ডেকে যায়। এ শহরের মুখটি দেখলে মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। শিল্প সংস্কৃতির চর্চা, লেখাপড়ার মধ্যদিয়ে মাইজদীর অলিগলি ঘুরে ফিরে আমার বেড়ে ওঠা। অনেক আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখের স্মৃতি দিয়ে নিবিড় বন্ধনে এ শহর আমাকে জড়িয়েছে।
নোয়াখালীর মানুষ ঝগড়াটে, জটিল ও কুটিল মনস্তত্তের অধিকারী এমনটা প্রায়শই অন্য জেলার অধিবাসীদের মুখে শোনা যায়। এখানকার মানুষ অনেক বেশি অতিথিপরায়ন, সংস্কৃতমনা ও মেধাবী এ দিকগুলো নোয়াখালীর নামটি ভালো ভাবে উচ্চারণের জন্য মনে স্থান দিতে হবে।
নোয়াখালী ভ্রমণে গেলে একজন পর্যটক কি দেখবেন সেটা নিয়ে আমরা নোয়াখালীবাসী ভাবনায় পড়ে যাই। অথচ প্রতিটি শহরেই কিছু না কিছু রয়েছে যা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে দেখা যায়। নোয়াখালী জেলাতেও রয়েছে এমনি কিছু দৃষ্টিনন্দন জায়গা। জয়াগ গান্ধী আশ্রম, বজরা শাহী মসজিদ, নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া দ্বীপ, মেঘনা ঘাট, ফরেস্ট, লুর্দের রানী গির্জা, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীনের বাড়ি, ব্রীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন স্মৃতিসৌধসহ কত সুন্দর সুন্দর নামের গ্রাম। নতুন কেউ এসে এক চক্কর ঘুরে বেড়াক না শহরের অলিগলি। দীঘি, পার্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক ভবন, রেলস্টেশন ঘুরে দেখলে অবশ্যই ভালো লাগবে। আসলে দেখার মন থাকলে যেকোন নতুন কিছু বা পুরাতন কিছু নতুন করে দেখার আনন্দই অন্যরকম।
একসময় নোয়াখালীবাসীর দুঃখ ছিল এখানে কোন নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। সেটাও অনেকখানি মিটেছে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ। তাছাড়া আছে ম্যাটস। এখন বাকী মাইজদী শহরকে পরিকল্পনামাফিক সাজিয়ে তোলা। সুধীজনরা সেটার জন্যও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একদিন নিশ্চয়ই সে স্বপ্নও সত্যি হবে।
আধুনিকায়নের সাথে সাথে নাগরিক সমস্যাও বাড়ছে। শহরের প্রধান সড়কে রীতিমত ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হয়। রাস্তার দুধারে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ শহরটিকে নোংরা করে ফেলেছে। পরিচ্ছন্ন শহর দেখে মনে যেমন প্রশান্তি আসে। অপিরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকলে সেখানে অন্য কিছু ভালো বলে মনে হবেনা।
নোয়াখালীর দক্ষিণে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। আয়তন বাড়ছে নোয়াখালী জেলার। এক কূলে নদীভাঙনে সর্বহারা মানুষ আরেকক‚লে নতুন মাটিতে ঘর বাঁধে। সেখানে শুধু প্রাণটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষ মাটির সাথে লড়াই করে। আনন্দহীন এ জীবনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন নামক বিষয়গুলোর কোন ছোঁয়া থাকেনা। তাদের চোখে কি স্বপ্ন থাকে? তারা বাঁচে কিসের আশায়! এই মানুষগুলোর কথা আমি কি কখনো ভেবেছি! নদীর বুকে কতশত মানুষের হাসি-আনন্দ, স্বপ্ন, আশা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে।
দরিদ্র্য মানুষের ভাগ্যয়োন্নয়নের জন্য প্রকল্পের কোন শেষ নেই। কিন্তু আদতে কি সেইসব মানুষের ভাগ্য বদলেছে। শোনা যায়, বাংলাদেশের মিলিয়নারদের মধ্যে অনেকেই নোয়াখালীর অধিবাসী। তারা কি কখনো জেলার উন্নয়নে কিংবা শহরের আধুনিকায়নে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বাস্তবে সেরকম কিছু কখনো চোখে পড়েনি। চর এলাকা, নদীভাঙন কবলিত মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পায়নে কোন বিনিয়োগে কে এগিয়ে এসেছেন। সুশীল সমাজের যে অংশটি শহর দাবড়িয়ে বেড়ায় বক্তৃতা, বিবৃতি আর কথার ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে তারা নোয়াখালী শহরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কি করতে পারেন একসাথে বসে কি কেউ ভেবেছেন। নানা দল নানা মতে বিভক্ত মানুষ সর্বজন স্বার্থ সম্পৃক্ত কাজে এক হওয়ার সাহস কখনো দেখায়নি।
নোয়াখালী প্রথম শ্রেণীর জেলা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। শুধুমাত্র কাগজে কলমে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা পাওয়া যথেষ্ট নয়। সারাদেশে নোয়াখালী জেলার সম্মান বৃদ্ধিতে প্রথম শ্রেণীর কাজ করার জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। দক্ষিণের বাতিঘর নোয়াখালী বাংলাদেশব্যাপি সফলতার আলো ছড়িয়ে দেবে এটা আমাদের প্রত্যাশা। প্রত্যাশা পূরণে নোয়াখালীবাসীর যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।






