অপরিকল্পিত ভাবে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে শহীদ জহির রায়হান মিলনায়তন : ফেনীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্থবিরতা
ফেনী থেকে জুলহাস তালুকদার-
গত কয়েক বছর ফেনীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন যেন জিমিয়ে পড়েছে। দীর্ঘ তিন যুগ ধরে ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্র মিজান রোডে অবস্থিত শহীদ জহির রায়হান মিলনায়তনটি ছিল ফেনীর একমাত্র সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্র। অপরিকল্পিত ভাবে মিলনায়তনটি ভেঙ্গে ফেলায় এ স্থবিরতার দেখা দিয়েছে বলে সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন।
ফেনীতে দীর্ঘদিন শহরের একমাত্র সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডর ও বিনোদনের স্থান হিসাবে শহীদ জহির রায়হান মিলনায়তটি ব্যবহার হয়ে আসছিল।  প্রায় চার বছর আগে মিলনায়তনটিকে জরাজীর্ন আখ্যায়িত করে  ফেনী জেলা পরিষদ সম্পূর্ন অপরিকল্পিত ভাবে এ মিলনায়তনটি ভেঙ্গে ফেলে। কিন্তু ওই স্থানে একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মান করা হবে বলা হলেও মন্ত্রনালয়ের রশি টানাটানির কারনে সেটি এখন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ফেনী জেলা পরিষদ সুত্র জানায়, ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্র মিজান রোডে ফেনী জেলা পরিষদের মালিকানাধীন ৬৫ শতাংশ জমির ওপর ১৯৭৭ সালে শহরের একমাত্র সাংস্কৃতিক চর্চ্চা ও বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে ৩০০ আসনের শহীদ জহির রায়হান মিলনায়তনটি নির্মাণ করা হয়।১৯৮২ সালে এটি পুনঃনির্মাণ করা হয়। মূল মিলনায়তনটি ছিল আধা পাকা, মিলনায়নের পেছনের অংশটি ছিল দ্বিতল এবং পূর্বাংশ ছিল একতলা। একতলা অংশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয় ও ড্রেসিং কক্ষ। দোতলায় ছিল শিল্পকলা একাডেমীর অফিস কক্ষ। সামনে ছিল ছোট একটি মাঠ। মিলনায়তনের দু‘পাশে জেলা পরিষদের মালিকানাধীন দু‘টি পুকুর এবং সামনের এক কোনে একটি অর্জুন গাছ গোটা এলাকার সৌন্দর্য্যরে প্রতীক হিসাবে ছিল। ১৯৮২ সালের পর বেশ কয়েকবার মিলনায়তনটি সংস্কার ও মেরামত করা হয়। কিন্তু আসবাবপত্র বিহীন পুরানো মিলনায়তনটি সময়ের চাহিদা পুরন করতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় নতুন ভবনের দাবি ওঠে।
২০০৮ সালে ৫০০ আসন বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মানের জন্য দরপত্র আহŸান করে জেলা পরিষদ। একই সময় পুরানো মিলনায়তনটি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন ভবনের দরপত্র বাছাই করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রনালয়ে প্রেরনের পর সিপিটিইউ‘র (সেন্ট্রাল প্রোকিউরমেন্ট টেকনিকেল ইউনিট) ওয়েভ সাইডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জটিলতার কারনে আর অনুমোদন পাওয়া যায়নি। ২৭/০৪/২০০৯ ইং জেলা পরিষদ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়। শুরু হয় চিঠি চালাচালি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এদিকে ১৫/০৪/২০১০ ইং ফেনী জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিয়মান এলজিইডি কর্তৃক প্রণীত টাইপ প্ল্যানে ৫০০ আসন বিশিষ্ট একতলা ভবনের পরিবর্তে বহুতলা ভবন নির্মান রে জহির রায়হান মিলনায়তনটিকে সময়ের চাহিদা পুরনের জন্য ১০০০ হাজার আসনের অডিটরিয়াম , নীচ তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, তৃতীয় তলায় আগের মত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অফিস ও প্রশিক্ষন কক্ষ এবং চতুর্থ তলায় বানিজ্যিক ভাবে ব্যবহারের উপযোগী ভবন নিমৃানের দাবি ওঠে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদকে মন্ত্রনালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সভায় সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।
জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক জেলা পরিষদ ১৮/০৫/২০১০ ইং সচিব স্থানীয় সরকার বিভাগকে একটি চিঠি দিয়ে বহুতল ভবন নির্মানের জন্য কনসালটেন্ট নিয়োগ করে ভবনের প্লান ও ডিজাইন প্রস্তুত করা অথবা এলজিইডি থেকে বহুতল আধুনিক ভবনের প্লান ডিজাইন সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী দরপত্র আহবান করা যেতে পারে বলে জানানো হয়।
এদিকে মন্ত্রনালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ১১/১০/১০ ইং এক চিঠিতে ফেনী জেলা পরিষদকে জানানো হয়, দেশের জেলা পরিষদ সমুহের অডিটরিয়াম নির্মানের লক্ষ্যে একটি টাইপ প্লান প্রণয়ন করা হচ্ছে। টাইপ প্ল্যানটি চুড়ান্ত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ অনুমোদিত টাইপ প্ল্যান অনুসরন করে তা করা হবে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ফেনীতে অনুষ্ঠিত পথনাটক উৎসব অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় নাট্য কর্মীরা শহীদ জহির রায়হান মিলনায়তন নির্মাণ নিয়ে অহেতুক চিঠি চালাচালির নিন্দা জানানো হয় এবং অবিলম্বে দরপত্র আহবান করে নির্মান কাজ শুরু দাবি জানানো হয়। ফেনী থিয়েটারের সুমন মাহমুদ, সংলাপের জাহিদ হোসেন খসরু, পুবালী সাংস্কৃতিক পরিষদের সমরজিৎ দাস টুটুল, আবৃতি সংসদের মনজুর তাজিম, আবৃতি চর্চ্চা কেন্দ্রের রাশেদ মাযাহার, আর্য্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সমর দেবনাথ, ফেনী নাট্য গোষ্ঠির ডা. ইসহাক, আবৃতি সংসদের নাজমুল হক শামীম একবাক্যে স্বীকার করেন, জহির রায়হান মিলনায়তনটি ভেঙ্গে ফেলায় ফেনীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন বর্তমানে ঝিমিয়ে পড়েছে। মিলনায়তনে বেশ কটি সংগঠনের অফিস ও মহড়া কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমানে সংগঠন গুলোর অফিস না থাকায় নাট্য চর্চ্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকন্ড অনেকটাই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। মিলনায়তনটি দ্রুত নির্মান না করা হলে ফেনীর সাংস্কৃতিক কর্মকন্ড অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
ফেনী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম মৈনুর সাথে আলাপকালে স্থানীয় সরকার বিভাগ ,এলজিইডি ও জেলা পরিষদের মধ্যে চিঠি চালাচালির সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, শহীদ জহির রায়হান মিলনায়তন নির্মানের জন্য এক কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকার তহবিল গত চার বছর পড়ে রয়েছে। কিন্তু প্ল্যান ডিজাইন পাশ না হওয়ায় কাজটি করা যাচ্ছে না। যত দ্রুত কাজটি করা যায় তার জন্য জেলা পরিষদ নিয়মিত স্থানীয় সরকার বিভাগের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে।      
জুলহাস, ফেনী।
01712872756  
<feniofficenewsroom@gmail.com>
বিশেষ প্রতিবেদন