-প্রফেসর এ কে এম সাঈদুল হক চৌধুরী-
শ্রদ্ধাভাজন লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর হাজার লক্ষ উদ্বৃতির মাঝে কয়েকটি আমার মনে
ভীষণভাবে দাগ কেটেছে। “তিনি তো শুধু একজন ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি বিপ্লব, একটি অভ্যুত্থান, জাতি নির্মাণের কারিগর, মহাকাব্যের অমরগাঁথা এবং একটি ইতিহাস’’ আর ইনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার জন্ম হয়েছিলো প্রায় ৯১ বছর পূর্বে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। সেদিন থেকে বাঙালী জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হলো। জন্ম নিলো ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বরের মত পৃথিবী কাঁপানো বাঙালী জাতির জীবনে বেশ কিছু সর্বশ্রেষ্ঠ স্মরণীয় দিনের। সৃষ্টি হলো বিশাল পৃথিবীর মাঝে ছোট্ট, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। দ্বিজাতিতত্ত্ব বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে বা শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক চিন্তা ধারা থেকে পাকিস্তান নামক দেশটির জন্ম যার সাথে ভৌগলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিশেষকরে ভাষার কোন মিল নেই। সঙ্গত কারণে ঐ দেশটি বাঙালী জাতির কোন সুখ বা শান্তি বয়ে আন্তে পারবে না এই ধারণাটি জন্মেছিলো সেদিন বাঙালীর রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের। সেদিন হতে মূলত আমাদের প্রিয় নেতার নেতৃত্বে ধীরে ধীরে শুরু হতে থাকলো পাকিস্তানী শাসকের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন। শুরু হলো রক্ত ঝরার ইতিহাস। জীবন দিতে হলো ৫২ ভাষা আন্দোলনে, মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালীর মুক্তি সনদ ৬ দফা আন্দোলনে, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনে, পাকিস্তানীদের সাজানো ‘মুজিব বনাম পাকিস্তান’ ষড়যন্ত্র মামলায়, ১৯৭০ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়েও মুজিবকে সরকার গঠন করতে দেয়া হয়নি পাকিস্তানী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস এবং পাকিস্তানী পছন্দ অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীদের সর্বাত্মক সমর্থনে। গোটা বাঙালী জাতি যখন নির্যাতিত হতে হতে জ্বলে পুড়ে তিলে তিলে ধ্বংশ হতে লাগলো তখনি বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতার আহবানে একাকার হয়ে গেল সারা দেশের মানুষ। কম্পিত হতে লাগলো তারই ধ্বনিতে। অভূতপূর্ব সাংগঠনিক শক্তি হয়তোবা আল্লাহ নিজেই তাঁকে অর্পণ করেছেন। সারা জাতি উদ্বুদ্ধ হলো মুজিবের নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। শুরু হলো স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি। অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ জাতি স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস ধ্বনিত হতে লাগলো, “আমার দেশ তোমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। আমার তোমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা”। পরিশেষে একটি স্লোগান প্রাতিষ্ঠানিক রুপ নিলো “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”। যেই মুহুর্তে সারা জাতি একাকার হয়ে নেতার নির্দেশের চূড়ান্ত অপেক্ষায়, ঠিক সেই সময়ই ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রবিবার ৩.১৫ টায় রমনার রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ শ্রোতাদের সামনে সেই বিশাল হৃদয়ের অধিকারী সুদর্শন চেহারার মানুষটি কখন হাজির হবে জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর অমর বাণী নিয়ে। সারা পৃথিবীতে বোধহয় এত বড় আত্মপ্রত্যয়ী মহান নেতার জন্ম হয়নি। “তাই শ্রদ্ধেয় কবি নির্মলেন্দু গুনের কবিতাটি যা আমার অতি প্রিয় “স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো। ”
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্তপায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিলো দোলা,
জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার, সকল দুয়ার খোলা-
কে রোধে তাঁর বজ্রকণ্ঠবাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
সে দিন হতে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলো। হঠাৎ করে ২৫ শে মার্চের মধ্য রাতে বর্বর পাক বাহিনীর নির্বিচার বাঙালী নিধন শুরু হলো। ফলে ২৬ শে মার্চেই প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেলো স্বাধীনতা যুদ্ধের। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাঙালী জাতি জয়ী হলো। খেশারত অনেক বেশি গুনতে হলো। ত্রিশ লক্ষ প্রাণ গেলো। লাখো লাখো মা বোন সম্ভ্রম হারালো। অগ্নি সংযোগে সারা দেশ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। লুণ্ঠন করে নিলো সকল সম্পদ ঐ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসররা।
এই হলো বাঙালী জাতির পিতা শেখ মুজিব। পরজন্মের বন্ধুদের জন্যই মূলত: আমার এই নিবেদনটি যেখানে অসত্যের কোন লেশ বা গন্ধ নেই। ৭ মার্চ ২০১১ বহু গুণীজন বঙ্গবন্ধু ও ৭ই মার্চকে কেন্দ্র করে বহু নিবন্ধ, কবিতা রচনা করেছেন সব পড়তে পারিনি তবুও সকলের প্রতি শ্রদ্ধাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এই ভেবে যে, পরজন্মের জন্য এগুলোই হচ্ছে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক দলিল। তাইতো ৭ মার্চ ২০১১ কবি নির্মলেন্দু গুন তাঁর লেখায় বলেছেন- “৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ-দিবস ঘোষিত হোক” - তৃতীয় বিশ্বের আপোষহীন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী হতে পারতো বিশ্বের মুক্তিকামী সকল মানুষের পাঠ্য বিষয়।
যুদ্ধ না দেখলেও আপনাদের লেখনি যুদ্ধের মধ্যে নিহিত আছে ৭১ এর যুদ্ধের সত্যিকার ইতিহাস। তাইতো আজ তাদের বিভ্রান্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশ আজ জাতির জনকের আদর্শে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় আস্থাশীল হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ২০২১ সালে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবেইতো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। পিতা মুজিব আমাদের অহংকার। তাঁর আদর্শ জাতির আস্থা, বিশ্বাস এবং একমাত্র পথ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯২ তম জন্মদিন উপলক্ষে চলমান নোয়াখালী র বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশ হতে যাচ্ছে জেনে আমি আনন্দিত। সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইলো অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
লেখক-
উপাচার্য
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
উপাচার্য
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়







