লক্ষ্মীপুরে সয়াবিনের রেকর্ড উৎপাদন
মিজানুর রহমান মানিক, লক্ষ্মীপুর12
সয়াবিনের রাজধানী খ্যাত লক্ষ্মীপুরে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। এর চাষাবাদ ও উৎপাদন অতীত রেকর্ড ছাড়িয়েছে। যেদিকেই চোখ যায় বিস্তৃত মাঠজুড়ে শুধুই সয়াবিন। জেলায় এবার প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। চাষাবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার সয়াবিন উৎপাদনের আশা করছে জেলা কৃষি অফিস। কোনো প্রকার দুর্যোগ না হলে কয়েকদিনের মধ্যে সমুদয় ফসল ঘরে তুলবেন কৃষক। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে আরও দুই থেকে তিনগুণ অর্থ লাভ করবেন এমন প্রত্যাশা করছেন সয়াবিনচাষিরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এম আমির হোসাইনের নেতৃত্বে শুক্রবার একটি টিম সরেজমিন জেলার কমলনগরের চরপাগলা গ্রামের বিস্তীর্ণ সয়াবিন মাঠ পরিদর্শন করেছেন। এ সময় মাঠ পর্যায়ে সয়াবিনের এ বাম্পার ফলনে প্রান্তিক চাষিদের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি।
জেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, দেশের ৬৫ ভাগ সয়াবিন লক্ষ্মীপুরে উৎপাদন হয়। চলতি বছর জেলায় সয়াবিন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৩৭ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের তুলনায় ৮১৫ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪ হাজার ৫শ' হেক্টর, রায়পুর উপজেলায় ৫ হাজার ৮৫ হেক্টর, রামগতি উপজেলায় ১২ হাজার ৮৮৫ হেক্টর, কমলনগর উপজেলায় ১৩ হাজার ৮০৭ হেক্টর ও রামগঞ্জ উপজেলায় ৬০ হেক্টর। একইসঙ্গে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬১ হাজার ৯৪৩ মেট্রিক টন। যেখানে গতবার উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার মেট্রিক টন। এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে চাষাবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অতীত রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশিøষ্টরা।
কমলনগর উপজেলার চরপাগলা গ্রামের সয়াবিন চাষি মাওলানা মোঃ সহিদ উল্যাহ জানান, তিনি ৪ একর জমিতে সয়াবিন চাষ করেছেন। কিছুদিন আগে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় কৃষি বিভাগীয় কর্মকর্তার পরামর্শে ওষুধ প্রয়োগ করেণ। এতে পোকা দমন হয়। বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলন হবে বলে তিনি আশা করছেন। বপনের সময় জমির মাটি ভিজা হওয়ায় ও কুয়াশার কারণে তার জমিতে প্রথম দফায় সয়াবিন গজায়নি। পরে বীজ সংগ্রহ করে দ্বিতীয় দফায় বুনেছেন। একই জমিতে দুই দফায় সয়াবিন বুনলেও ফলন ভালো হওয়ায় সব খরচ মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ লাভের মুখ দেখা দিয়েছে। তার হিসাবে, দুই দফায় খরচের যোগে একরপ্রতি পড়েছে ৮ হাজার টাকা করে। সম্ভাবনা আছে, একর প্রতি ২০ হাজার টাকার সয়াবিন ঘরে ওঠার। তার মতো অনেকেরই জমিতে একাধিকবার সয়াবিন বুনতে হয়েছে। চরপাগলার কৃষক আবুল কাশেম, ফয়েজ আহমদ, হাফেজ হেমায়েত উদ্দিনসহ অন্য কৃষকদের বক্তব্য একই। অবশ্য এখন তারা আশা করছেন, ফলন ভালো হয়েছে তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ ক্ষতি কাটিয়ে অধিক লাভবান হবেন।
কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, একশ্রেণীর দাদন ব্যবসায়ীর কবলে পড়ে প্রান্তিক কৃষক সয়াবিনের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কমমূল্যে দাদন ব্যবসায়ীরা আগাম সয়াবিন কিনে নিচ্ছেন। সয়াবিনের জন্য নামমাত্র শতকরা ২ টাকা সুদের কৃষি ঋণ চালু থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ কৃষকদের জন্য তা সহজলভ্য নয়। কৃষকদের প্রত্যাশা, সয়াবিনের রাজধানী খ্যাত ল²ীপুরে গড়ে উঠুক সয়াবিনভিত্তিক কারখানা এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হোক দাদন ব্যবসায়ীদের। এছাড়া কৃষকরা জানিয়েছেন, দেশের উৎপাদিত সয়াবিনের ৮০ ভাগ এ জেলায় উৎপাদিত হলেও এখানে সয়াবিনভিত্তিক কোনো শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠায় উৎপাদিত ফসল বাজারজাতকরণে কৃষকদের নানা বিপাকে পড়তে হয়। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে তাদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে। সরকারি উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল যেভাবে সংগ্রহ করা হয় সেভাবে সয়াবিনও যেন সরকারি উদ্যোগে সংগ্রহ করা হয় তার দাবি কৃষকদের। তারা দাবি করেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শিগগিরই ল²ীপুরে সয়াবিনভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হোক। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেয়ে সয়াবিন চাষে আরও বেশি আগ্রহী হবে।
জেলা কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক এম আমির হোসাইন জানান, সয়াবিন চাষ করার জন্য সরকারিভাবে কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে চাষাবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় শতভাগ অর্জিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে জেলায় এবার দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি সয়াবিন উৎপাদন হবে।