হাইব্রিডে স্বপ্নভঙ্গ- চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেছে ২৩ কোটি টাকার ফসল : নোয়াখালীর হাজার হাজার কৃষক সর্বশান্ত
11
রুদ্র মাসুদ-
ধান লাগাইছি নিজেরা খাইতাম, আর অন হেই ধান গরুরে খাবাইয়ুম। ১২ গন্ডা (৭২ শতক) জমিত হাইব্রিড ঝলক ধান লাগাইছি, ১৫ হাজার টাকা খরছ করি অন খের (খড়) ছাড়া কিছু হাইতাম ন। চৈত্রের তপ্ত দুপুরে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান ক্ষেতে থেকে ধান গাছ কাটতে কাটতে ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বলছিলেন বেগমগঞ্জের কিসমত আব্দুল্যাপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান (৫৭)।
পার্শ্ববর্তী কৃষক রেজাউল হক জানালে তিনিও ১২ গন্ডা জমিতে লাগিয়েছিলেন ঝলক জাতের হাইব্রিড ধান। ধান গাছে থোঁড় আসার পর কয়েকদিন পূর্বে ধানের কান্ডের মধ্যে রোগ দেখা দেয়। এনিয়ে কাজীর হাট বাজারের বীজ ব্যবসায়ী বাহারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাকে দেখিয়ে দেন। উপ-সহকারির কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে কীটনাশক ব্যবহার করি। এতে ৫’শ টাকা খরছ হয় কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পুরে জমির ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, রেজাউল কিংবা আব্দুর রহমান নয় বেগমগঞ্জের রসুলপুর ইউনিয়নের নুরুল্যা জিসানের ৯০ শতক, বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাইমুড়ি উপজেলার অম্বর নগর গ্রামের আব্দুল ওহাব তপনের দেড় একর, আবুল হাসেম ও আবুল খায়েরের প্রায় দুই একর জমির ঝলক ধান নষ্ট হয়ে গেছে সম্পূর্ণ। ধান গাছ সবুজ থাকলেও চিটা হয়ে গেছে সব ধান। এদিকে ঝলক আবাদ করা হয়েছে এমন জমি থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে সংলগ্ন বিআর-১৬ ও ২৯ জাতের ধান লাগানো হয়েছে এমন জমিও আক্রান্ত হওয়ায় কৃষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। কৃষকদের মতে ডিলারের কাছ থেকে বীজ কিনে তারা প্রতারিত। অথচ ডিলারদের কাছে প্রতিকার চাইতে গেলে তারা কৃষি কর্মকর্তাদের 12দেখিয়ে দেয়। একই সাথে ইউনিয়নের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি সময়মতো সহযোগীতা।
এদের মতো নোয়াখালীর হাজার হাজার কৃষক চলতি বরো মওসুমে অধিক ফলনের আসায় জমিতে এনার্জিপ্যাক এগ্রো লিমিটেড কোম্পানীর হাইব্রিড ঝলক জাতের ধান লাগিয়ে এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ভুগছেন। কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা তৈরী করলেও কৃষকরা কোন ক্ষতিপূরণ পাবে কিনা এব্যাপারে কিছুই জানাতে পারেনি। সদুত্তর মিলেনি বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও। অথচ হাজার হাজার কৃষকের চোখের সামনেই নষ্ট হয়ে গেছে কষ্টার্জিত ২৩ কোটি টাকার ফসল।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সুত্রে জানা যায়, চলতি বোরে মওসুমে নোয়াখালীতে ৫৭ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে। তন্মধ্যে হাইব্রিড আবাদ করা হয় ৩১ হাজার ৩৫১ হেক্টর জমিতে। আর ঝলক জাতের হাইব্রিড আবাদ করা হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া সহস্রাধিক হেক্টর জমিতে লাগানো হয়েছে ‘তেজ’ জাতের হাইব্রিড ধান। ঝলক সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, তেজ জাতের ধানের অবস্থাও ভালো নয়। আমদানীকৃত ঝলক ধানের বীজবাহিত ভাইরাসের কারণেই এ বিপর্যয় হয়েছে। তবে; উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা তৈরী করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে হাইব্রিড জাতের হেক্টর প্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৩ মেঃটন (চাউলের হিসাবে)। এ হিসাব অনুযায়ী ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ঝলক ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায কৃষকরে ৭ হাজার ৯৫ মেঃটন চাউল উৎপাদন সম্পূর্ণ ব্যহত হয়েছে। চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাওয়া এই ফসলের বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী  দাম দাড়ায় ২৩ কোটি ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বেগমগঞ্জ উপজেলায় তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের সংখ্যা ১ হাজার ৯৮০জন, সোনাইমুড়িতে ১ হাজার। চাটখিলেও একই অবস্থা। এছাড়া সেনবাগ, সদর ও কবিরহাটেও 13ঝলক ও তেজ জাতের হাইব্রিড আবাদকারী কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ঝলক জাতের ধান বীজ বিক্রেতা সোনাইমুড়ি উপজেলার কাশিপুর বাজারের বীজ ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন কৃষকদের অভিযোগের কথা স্বীকার করে বলেন, এ বিষেয় আমরা এনার্জিপ্যাক কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছে চীনের বীজ কোম্পানীর সাথে কথা বলে আমাদেরকে জানাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কৃষিবিদ জানান, বিআর-১৬, ২৯ সহ বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল (উপশি) জাতের ধান আবাদ করে হাইব্রিডের কাছাকাছি ফলন পাওয়া গেলেও ধান বীজ বাজারজাতকারী কোম্পানীগুলোর প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা দিশেহারা। একই সাথে বিএডিসিসহ সরকারের বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের নতুন নতুনজাতের বীজ উদ্ভাবন ও বিদ্যমান জাতসমূহের ধান বীজ উৎপাদনে ধীর গতি সর্বপরি বীজ বাজারজাতকারী কোম্পানীসমূহের সাথে আঁতাতের কারণেই অধিক ফলনের আশায় হাইব্রিডের দিকে ঝুকে পড়ে। অথচ হাইব্রিডের চেয়ে উচ্চফলনশীল বিআর জাতের ধানের রোগ প্রতিরোধ ÿমতা বেশী এবং ঝুঁকিও কম।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ নোয়াখালী’র উপ-পরিচালক নৃপেন্দ্র কুমার সরকার সমকালকে বলেন, বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বীজ বিমান বন্দর ও স্থল বন্দরে পরীক্ষা করে থাকে কোয়ারেন্টাইম নামের সরকারি সংস্থা। তারা পরীক্ষা করে বীজ জীবানুমুক্ত ঘোষণা করে থাকে। তাহলে বীজবাহিত ভাইরাসে কেনো ঝলকজাতের ধান আক্রান্ত হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন- এ প্রশ্নতো আমারও। কৃষকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের তালিকা  করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ঝলক বীজ কোম্পানীর সাথে কথা হয়েছে তারা যদি কোন ক্ষতিপূরণ দেয় তাহলে কৃষক পাবে। এছাড়া সরকারের কোন কর্মসূচী নাই।

কৃষি ও অর্থনীতি