বিশেষ প্রতিনিধি- নদীভাঙ্গনে সর্বশান্তদের একজন তাজুল ইসলাম (৪২)। সাহেবের হাট মাছ ঘাটে তাঁর বাড়ি ইতোমধ্যে মেঘনা গিলে ফেলেছে। ঘর দরজাও তিনি সরিয়ে নিয়েছেন। অবশিষ্ট ছিলো একটি খাট। ভিটিতে সেই খাট পেতে তাজুল ইসলাম বসে ছিলেন। ভিটিটা ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেয়ে যেনো কেউ তাতে ঘর তুলতে না পারে সেজন্য তিনি অপেক্ষা করছেন। পাশাপাশি গাছ কেটে কাঠ তৈরী করাচ্ছেন মিস্ত্রি দিয়ে। কারণ যেখানেই থাকতে হবে ঘর করতে কাঠতো লাগবে। শেষ পর্যন্ত বাড়িটি রক্ষায় হয়নি তাজুল ইসলামের। পাশেই একটি বরফকল তুলে নিতে ব্যস্ত মালিক পক্ষ। কারণ ইট বালু যা পাওয়া যায়। বরফ কলের পেছনে কালকিনি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের পাকা বাড়ি তখনো দন্ডায়মান। রবিবার জানা গেলে তফাজ্জল মেম্বারের বাড়িটি ছাড়িয়ে এখন সাহেবের হাঁট বাজার পর্যন্ত চলে গেছে ভাঙ্গন। মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক জনপদ। ফলে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা। ভাঙ্গনের ছোবল লেগেছে রামগতি উপজেলায়ও। গত তিন বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৭৫ বর্গকিঃমিঃ এলাকা। এতে গৃহহীন হয়েছে কমপক্ষে ১০ হাজারেরও বেশি পরিবার। প্রতিদিনই মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। তাদের দাবি চাঁদপুর ও সিরাজগঞ্জের মতো ভাঙ্গন ঠেকাতে অভিলম্বে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এদিকে ভাঙ্গন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরিকল্পিতভাবে মেঘনা থেকে বালু উত্তোলনে ভাঙ্গন ভয়াবহ আকার ধারণ করায় করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অপরদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে তাদের কিছুই করার নেই।
ষাটোর্ধ্ব আব্দুর রবের মুখে তীব্র ক্ষোভ। বালু উত্তোলনের মতো অপরিনামদর্শী কাজে সরকারের বাধা না দেয়ায় তার ক্ষোভ আর স্বর্বস্ব হারানোর যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মুখে বললেন ‘‘ বালু উডানের কারণে আঙ্গো বাড়ি ঘর বে¹িন ভাঙ্গি গেছে”। আবার শান্ত গলায় সাবেক এই ইউপি সদস্য বললেন, নদী থেকে বালি উত্তোলন বন্ধ করলে এবং মাঝ নদীতে জেগে ওঠা চর ড্রেজিং করলে হয়তো ভাঙ্গন কিছুটা হ্রাস পেতো। গত ২৫ আগষ্ট মঙ্গলবার সরজেমিনে গেলে লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর ইউনিয়নের ভাঙ্গন কবলিত চরকালকিনি ইউনিয়নের সাহেবের হাঁটে সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর রবের মতো অনেকেই বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙ্গনের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরেন। মতির হাটে সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান, আলতাফ হোসেন, নাগর মাঝি, জসিম উদ্দীনের মতো অগণিত মানুষ জানালেন, গত চৈত্র মাসেও যে জমিতে সোনালী ধান ছিলো সেই জমি এখন নদী গর্ভে। একদিন তারা নদীভাঙ্গা মানুষকে এ মানুষগুলো রায়ত (থাকার জায়গা) দিতে তারাই এখন অন্যের জমিতে রায়ত থাকতে হচ্ছে। তিন বছর পূর্বে নদী ভাঙ্গন শুরু হলেও মতির হাটা এলাকায় বালু উত্তোলনের পর ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করে। তাদের দাবি যদি মাঝ নদীতে ডুবো চর ড্রেজিং করতো তাহলে ভাঙ্গন কম হতো। অথচ বালু উত্তোলন করা হয়েছে কুল ঘেষে গভীর এলাকা থেকে। মতির হাঁটের পাশেই দেখা গেলো বিশাল আকারের বালুর স্তুপ। যা দেখতো রীতিমতো পাহাড়ের মতো। এই বালুর পাহাড় থেকে ট্রাক এবং পিকআপে করে বালু বোঝাই করে বিক্রির আয়োজন চলছে। নদীভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানের জামাল উদ্দীন, জসিম এবং আরমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন এই বালুই আমাদের সর্বনাশ করেছে। অথচ সরকার নির্বিকার। উপজেলা, জেলা থেকে শুরু করে বিভাগীয় কমিশনার পর্যন্ত তাদের এই দুঃখ দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের কর্মকর্তাদের কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি গত দুই বছরেও। স্থানীয় লোকজন জানান, ভোলার বঙ্গের চর থেকে স্রোতের ধাক্কা লেগে তা আঘাত করে কমলনগরে। যার ফলে দ্রুত ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে এই এলাকা। ইতোমধ্যে ভাঙ্গনে চরকালকিনির ৫টি ওয়ার্ড, চরকাঁকড়া, চরসামছুদ্দীন, চুরির চর, বোয়ালিয়ার চর, চলগা গুচ্ছগ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে দৈর্ঘ্যে ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থে প্রায় ৫ কিলোমিটার (মোট ৭৫বর্গকিঃমিঃ) এলাকা ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে। হুমকির মুখে রযেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। এছাড়া লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী থেকে বালু উত্তোলন করার কথা থাকলেও লক্ষ্মীপুর শহরের প্রভাবশালী ব্যক্তি কবির, হান্নান ও সাবু সিন্ডিকেট কমলনগর এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করায় মানুষকে বেশি ক্ষতির সন্মুখীন হতে হয়েছে।
কমল নগর উপজেলার মতির হাঁট থেকে ফলকন ঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটার নদী পথে ঘুরে গেছে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন। ভাঙ্গনে প্রতিনিয়ত নদীতে হেলে পড়ছে গাছপালা ও বাড়ি ঘর। ভাঙ্গন কবলিত মানুষ ঘরদরজা সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। কেউ কেউ নিজের জায়গা থেকে গাছ কেটে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ আবার রাস্তা থেকে ইট সুরকি তুলতে ব্যস্ত। লদুয়া বাজারের কাছে একটি ব্রীজ ভেঙ্গ ইট সুরকি এবং রড খুলে নিচ্ছে কিছু মানুষ। গোটা কমল নগর উপকূল জুড়ে শোকের মাতম সর্বস্ব হারানো মানুষের। তাদের আর্তনাদ পৌঁছেনা শহরের এসি কক্ষে বসে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের কানে। কালকিনি ইউপি চেয়ারম্যান মাষ্টার মোঃ ছাইফ উল্যাহ জানান, জরুরী অবস্থা থাকার কারণে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি ভাঙ্গন কবলিত মানুষ। যারা বালু উত্তোলন করে তারা লক্ষ্মীপুর সদরের প্রভাবশালী তাদের বিরুদ্ধেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না। তিনি বালু উত্তোলনকারীদের পরিচয় জানাতে পারেনি। কিছু নাম বলার পর সায় দেন। তিনি জানান, চলতি বর্ষায় তার ইউনিয়নের চারটি ব্রীজ মেঘনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাহী সাহেবেরহাট বাজার ও মাদ্রাসা চরম হুমকির মুখে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে অতি অল্পদিনের মধ্যে বাজার ও মাদ্রাসা হারিয়ে যেতে পারে মেঘনায়। এছাড়া তালতলী বাজার এলাকায় হাাই স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউিনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র এমনকি ইউপি কমপ্লেক্সটিও হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে ৭ হাজার একর ফসলি জমি হারিয়ে গেছে মেঘনায়। ২ হাজারেরও বেশি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীণ হয়েছে। এতে গৃহহীন হয়েছে অন্তত ১০ হাজার মানুষ। কালকিনি ইউনিয়নের ২ কিঃমিঃ পাকা রাস্তা, মতিরহাট থেকে লদুয়া পর্যন্ত ১০ কিঃমিঃ বেড়ি বাঁধ, ২টি স্লুইচ গেইট, ২০টি মসজিদ, অগণিত ব্রীজ কালভার্ট, চরকালকিনি এছহাকিয়া রেঃজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চরফলকন ইউপি চেয়ারম্যান রাসেদ বিল্লা জানান, ভাঙ্গনে তার ইউনিয়নের ২ শতাধিক বাড়ি ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এছাড়া সহস্রাধিক একরের ফসলী জমি, ৫ কিঃমিঃ রাস্তা ও বেড়ি ভেঙ্গে গেছে। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলেও তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় কয়েক মাসের মধ্যে নদীতে বিলীন হবে শত শত বাড়ি ঘর।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন সমকালের সাথে আলাপকালে কমল নগরের এ ভাঙ্গন ঠেকাতে তাঁর দপ্তরের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এ ভাঙ্গন চলছে। ভোলা এবং কমলনগরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীর দৈর্ঘ প্রায় ২০ কিলোমিটার। এই বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য ডুবোচর রয়েছে এগুলো কেটে দিতে পারলে ভাঙ্গন হ্রাস পেতো কিন্তু এতো বিস্তীর্ণ এলাকায় ড্রেজিং করার সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে মেঘানার ভাঙ্গনে তাদের সাড়ে ৭ কিলোমিটার বেড়ি এবং দুটি স্লুইচ গেইট নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ভাঙ্গন নদীর চিরাচরিত নিয়ম। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ভাঙ্গছে। এ অঞ্চলে ভাঙ্গন ঠেকাতে চাঁদপুর কিংবা সিরাজগঞ্জের মতো বড় প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। তবে কমলনগরে ভাঙ্গন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তারা মন্ত্রনালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এরপর সাম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রকল্প গ্রহণ করতে হলেও বিপুল পরিমান অর্থের প্রয়োজন। বালু উত্তোলন সম্পর্কে বলেন, শুধুমাত্র বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে এটি সত্য নয়। বালু উত্তোলনের জন্য জেলা প্রশাসন ইজারা দিয়ে থাকে এক্ষেত্রে তাঁর কিছুই করার নেই। তবে তিনি এসংক্রান্ত কমিটির মেম্বার। এছাড়া বালু উত্তোলন করার কথা সদর উপজেলার চররমনী থেকে। কোন জায়গা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সরেজমিনে গিয়ে কখনো গিয়ে দেখেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘‘না’’ সূচক জবাব দেন।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জাফর আলম জানান, ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য তিনি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে চিঠি দেয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে বলা হয়। আর বালু উত্তোলনের বিষয়টি জেলা প্রশাসন থেকে দেখা হয়। এবিষয়ে তিনি কিছু বলতে অপারাগতা প্রকাশ করেন।






