নোয়াখালীতে আমন কাটার ধুম : বর্ষা ইরির আশাতীত ফলনে চরবাসীর মুখে হাসি
11
রুদ্র মাসুদ-
আগে রাজাআইল কইত্তাম, এইবার কইচ্চি বর্ষা ইরি। গন্ডায় রাজাইল যিয়ানে হাইতাম দুই-আড়াই মন হিয়ানে বর্ষা ইরি করি হামু হাড়ে তিন মন তুন চাইর মন। ১৪ গন্ডা জমিত বর্ষা ইরি কইচ্চি, আল্লায় দিলে ৪৫-৫০ মন ধান হামু। সুনর্বচর উপজেলার দক্ষিণ চরমজিদ বেঁড়ির বাইরে নিজ জমিতে জনাদশেক লোক নিয়ে ধান কাটার ফাঁকে উচ্চসিত কন্ঠে এভাবেই সমকালের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ভূমিহীন একরাম হোসেন।  
নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে চারদিকে বিস্তীর্ণ আমনের ক্ষেতে এখন ধান কাটার ধুম। ফসলের মাঠ জুড়ে সোনালী ফসলে কৃষকের আনন্দের কমতি নেই। আর এই আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘বর্ষা ইরি’ নামের উচ্চফলনশীল জাতের ধান। এই বর্ষা ইরির আশাতীত ফলনে হাসি ফুটিয়েছে চরবাসীর মুখে। তবে; চরাঞ্চলের কৃষকের কাছে অধিক ফলনের বর্ষা ইরি আর্শিবাদ হলেও কৃষি বিভাগের কাছে এই ধানের কোন তথ্য নেই। তাঁরা বলছে হয়তো ভালো ধান হয়েছে তাই কৃষকেরা নিজেরাই বর্ষা ইরি নাম দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, এবার নোয়াখালীতে ১ লাখ ৫৭ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়। তন্মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাত এবং ৪৯ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে উচ্চফলন শীল জাতের ধান আবাদ করা হয়। হেক্টর প্রতি স্থানীয় জাতের ১ দশমিক ৫৯ মেঃটন (চাউল) এবং উচ্চফলনশীল জাতের ২ দশমিক ৭২ মেঃটন (চাউল) উৎপাদন ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী মোট ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৭ মেঃটন চাউল উৎপাদনের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন ল্যমাত্রা ছড়িয়ে যাবে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে জেলার মূলভুখন্ডের সর্বদক্ষিনের সুবর্নচর উপজেলা এবং দ্বীপ উপজেলার হাতিয়ার মধ্যবর্তী চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে সোনালী ধানের সমারোহ। পেকে যাওয়া ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষকরা।12
বয়ারচর-নঙ্গলিয়ার চরের ক্রসড্যামের পূর্বপাড়ের কৃষক মঈন উদ্দিন তাঁর রাজাশাইল এবং বর্ষা ইরির দুটি আবাদী জমি দেখিয়ে বলেন, দুটি জমিতেই ভালো ফলন হয়েছে এবার। তবে; রাজাশাইলের চেয়ে অন্তত দেড়গুন ফলন পাবেন বর্ষা ইরিতে। তাঁর মতে জলাবদ্ধ জমি এবং লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে এমন জমিতে বর্ষা ইরি করা যায় না। তাই বেশীরভাগ কৃষকই রাজাশাইল, কাজলশাইলসহ স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করে বেশী। তবে বর্ষা ইরি এবার কৃষকদের মাঝে বেশ সাড়া জাগিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃষ্টি পানি না নামতে পারার কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে সেনবাগ, সদর, কবিরহাট ও সুবর্নচর উপজেলার বেশীরভাগ জমিতে বাধ্য হয়েই কৃষকরা আমন মওসুমে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করে থাকে। একইভাবে জোয়ারে লবন পানি প্রবেশ করার কারণে নদী পাড়ের চরগুলোতেও স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করতে হয়। তবে; অনক‚ল আবহাওয়ার কারণে এবার নোয়াখালীতে স্থানীয় এবং উচ্চফলনশীল উভয় জাতের ধানের আশাতীত ফলন হয়েছে। কৃষকদের দাবি উৎপাদন বাড়াতে হলে কৃষি বিভাগকেই অধিক ফলনশীল জাতের ধানবীজ কৃষকদের দৌরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে, অথচ কৃষি বিভাগের এনিয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না।
এদিক বর্ষা ইরির বাম্পার ফলনে কৃষকরা উদ্বেলিত হলেও নোয়াখালীর কৃষি সম্প্রসারন বিভাগের উপ-পরিচালক আমির হোসেন বলেন, বর্ষা ইরি নামের কোন ধানের জাত নেই। উচ্চফলনশীল লবন সহিষ্ণু বিনা-৭ কিংবা বিআর-৫২ যারা লাগিয়েছেন তাঁদের জমিতে বেশী ফলন হওয়ায় হয়তো তাঁরা এর নাম বর্ষা ইরি দিয়ে থাকতে পারেন। মাঠ পরিদর্শন করে অধিক ফলনশীল জাত চিহ্ণিত করে আগামি মওসুমে তা আবাদে কৃষি বিভাগ প্রচারণা চালাবে বলে তিনি জানান। তবে; কৃষকদের মতো তিনিও দাবি করেন, এবার আমনের বাম্পার ফলনের বিষয়টি।
121
কৃষি ও অর্থনীতি