মানুষের রক্ত ঝরিয়ে ক্ষমতায় গিয়েই মহাজোটের সরকার প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেছে- খালেদা জিয়া

রুদ্র মাসুদ- ১২ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও ষড়যন্ত্রের জবাব দেয়ার আহবান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছেন, মানুষের রক্ত ঝরিয়ে ক্ষমতায় গিয়েই মহাজোটের সরকার প্রতিশ্র“তির কথা ভুলে গেছে। ১০ টাকা কেজি চাল, বিনামূল্যে সার আর প্রতিটি ঘরে ১টি করে চাকরি দেয়ার কথা বললেও ত এখন অস্বীকার করছে। দেশবাসী তাদের এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। কথা রাখলে আমরাও সরকারকে সহযোগিতা করবো। ওয়াদা পূরণ না হলে কিংবা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা মোকবেলা করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, তত্ত¡বধায়ক সরকার নিরপেক্ষ থাকার কথা বললেও তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। কি ধরণের কারচুপি হয়েছে তা দেশবাসীর কাছে পরিস্কার। ষড়যন্ত্র করে বিএনপিকে হারানো হয়েছে। প্রশাসনকে বলে দিতে চাই ১২ জানুয়ারির নির্বাচনে যেনো কোন কারচুপি না হয়। নির্বাচনে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ১২ জানুয়ারির নির্বাচনে ষড়যন্ত্র ও কারচুপির বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে। শুক্রবার বিকালে ও সন্ধ্যায় নোয়াখালী-১ আসনের স্থগিত নির্বাচনী এলাকায় দলীয় প্রার্থী ব্যারিষ্টার এ এম মাহবুব উদ্দীন খোকনের সমর্থনে আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। একই আসনের সোনাইমুড়ী উচ্চ বিদ্যালয় এবং চাটখিল পিজি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন তিনি। নোয়াখালী-১ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার সদস্য ব্যারিষ্টার সদস্য মওদুদ আহমদ, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বেগম সেলিমা রহমান, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সালাহ উদ্দীন কাদের চৌধুরী, বরকত উল্যা বুলু, জয়নুল আবেদীন ফারুক, আশরাফ উদ্দীন নিজান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, জেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ শাহজাহান, জেলা জামাতের আমির মাওলানা মোনায়েম, সাবেক সংসদ সদস্য আহম্মদ নজীর, সাইমুন বেগম, হেলেন জেরিন খান, ঢাকা-১১ আসনের চারদলীয় জোট প্রার্থী সাহাবউদ্দীন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু প্রমুখ। স্থগিত হওয়া নোয়াখালী-১ আসনের নির্বাচী গণসংযোগ উপলক্ষে বেলা পৌনে ১১টায় সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসা থেকে বের হন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী ও চাটখিলের জনসভায় যোগদানের আগে কুমিল্লা সার্কিট হাউজে যাত্রাবিরতি করেন তিনি। সেখানে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এর পর তিনি বিকাল সাড়ে ৪টায় তিনি সোনাইমুড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের জনসভায় যোগদান করেন। খালেদা জিয়া বলেন, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। ষড়যন্ত্র ও কারচুপি করে আমাদের হারানো হয়েছে। কারচুপির সঙ্গে নির্বাচন কমিশন জড়িত। নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচন করবে বলেছে; সেটি আমরা দেখেছি। বিভিন্ন জায়গায় ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে, ধানক্ষেতে-পুকুরে ব্যালটের মুড়ি পাওয়া গেছে ; ভোট যে নিরপেক্ষ হয়নি সেটাই এর প্রমান। কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন দেখেই নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে বলা যাবে না। দুপুর ১২টার মধ্যে ভোট কেন্দ্র খালি। দুপুর ১টায় আমি কেন্দ্রে গিয়ে দেখি ভোটার শূন্য কোন কর্মকর্তা নেই। উপস্থিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাস করলে তারা বলেছে; কেউ লাঞ্চে গেছে কেউ নামাজে গেছে। এমনটি হবার কথা ছিলো ? কোন কোন কেন্দ্রে ১শ পার্সেন্ট ভোট পড়েছে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন করেছে। তাদের নিরপেক্ষ থাকার কথা ছিলো কিন্তু তারা থাকেনি। একটি জোটের পক্ষে কাজ করেছে। গত দুটি বছর দেশের মানুষ কষ্ট করেছে। দ্রব্যমূল্যের উধ্বগতি, সকল ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে এবং দেশে বেকারত্ব বেড়ে গেছে। তখন দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে। তাই আমরা নির্বাচনে গিয়েছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বাইরে থেকে দেখিয়েছে একরকম কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা নানা রকম কৌশল অবলম্বন করে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, জনগণকে প্রতিশ্র“তি দিয়ে যারা ক্ষমতায় গেছে ক্ষমতায় বসে তারা প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে। যাদের হাতে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নেই এবং যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদেরকে ভোট দিলে দেশের ক্ষতি হবে জনগণের ক্ষতি হবে। ৯৬ সালে যেদিন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গিয়েছিলো সেদিন নোয়াখালীতে ছাত্রদলের সুমনকে হত্যা করা হয়। তখন সুমনের রক্ত ওপর দিয়ে তারা ক্ষমতায় যায়। এবার শপথ নেয়ার আগের দিন স্বেচ্ছাসেবদলের নেতা নজরুল ইসলামকে হত্যা করেছে। তারা প্রতি পদে পদে হত্যা সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। আজ কৃষকরা বিনামূল্যে সার চায়। ১০ টাকায় চাউল চায়। বেকার যুবকরা চাকরি চায়। আমরা বলেছি সহযোগিতা করবো; জনগণ সেসকল প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। এখন তারা (সরকার) বলছে তারা এসকল প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ওয়াদা পূরণ না হলে কিংবা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা মোকবেলা করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী) আসনের চারদলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিষ্টার মাহবুব উদ্দীন খোকনের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গিয়ে মানুষদের ওপর নির্যাতন, ঘরবাড়ি দখল, হত্যা ও লুণ্ঠন আরম্ভ করেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের, নিরীহ জনগণকে এবং মা বোনদের হত্যা করা হয়েছে। যদি মা বোনদের সম্মান ও নিরপত্তা দিতে চান এবং এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হলে ব্যারিষ্টার মাহবুবু উদ্দীন খোকনে নির্বাচিত করুন। গত ২টি বছর যখন একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে আমার দলের নেতাকর্মী এবং পরিবারের সদস্যদের হয়রানী করা হয়েছে তখন ব্যারিষ্টার খোকন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাকে ভোট দিলে আপনাদের পাশে দাঁড়াবে। অন্যকে ভোট দিলে আপনাদের পাশে থাকবে না। বিএনপি চেয়ারপার্সন জনসভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আমি জানি বিএনপির প্রতি ধানের শীষের প্রতি আপনাদের বিশেষ দূর্বলতা আছে। তাই সৎ এবং ইয়াং ব্যারিষ্টার খোকনকে মনোনয়ন দিয়েছি। তাকে ভোট দিলে আপনাদের পাশে থাকবে। তবে লক্ষ্য রাখবেন এবার যেনো কারচুপি না হয়। প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা দেখেছি ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কি কি কারচুপি হয়েছে। আমরাই চাই ত্রুটিগুলো দূর করে সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন। ১২ জানুয়ারির নির্বাচনে কোন ধরণের কারচুপি হলে তারজন্য তাদেরকে দায়ি থাকতে হবে। তাই প্রশাসনকে বলে দিতে চাই তারা যেনো নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন। ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ১২ জানুয়ারির নির্বাচনে ব্যারিষ্টার খোকনকে নির্বাচিত করলে ২৯ ডিসেম্বরের পাতানো নির্বাচনের কঠিন জবাব হবে। সালাহ উদ্দীন কাদের চৌধুরী বলেন, আওয়ামীলীগের অপর নাম প্রতারণার লীগ, ভাওতার লীগ। ডিজিটাল নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের পরাজিত করা হয়েছে। সন্ধ্যায় চাটখিল উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম ভূঁঞার সভাপতিত্বে চাটখিল পিজি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভা শেষে রাতে খালেদা জিয়া ঢাকার উদ্দেশ্যে নোয়াখালী ত্যাগ করেন। উল্লেখ্য, নোয়াখালী-১ (সোনাইমুড়ী-চাটখিল) আসনের মহাজোট প্রার্থী গণতন্ত্রি পার্টির সভাপতি নরুল ইসলামের মৃত্যুর কারণে এ আসনের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। আগামি ১২ জানুয়ারি এ আসনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির সকল কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হবে- কুমিল্লা সার্কিট হাউজে মতবিনিময়কালে নেতাকর্মীরা দলের বিশ্বাসঘাতকদের দল থেকে বহিস্কারের দাবি জানান। তারা বলেন প্রশাসনের কারচুপি ছাড়াও দলের নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতা দলের পরাজয়ের জন্য দায়ী। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই দাবি নিয়ে সার্কিট হাউজে উপস্থিত দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল হইচই শুরু হয়। পরে খন্দকার মোশারফ হোসেনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এসময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপির ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। ২ বছর ধরে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার চেয়েছিলা। ভেবেছিলাম সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে; কিন্তু বিএনপিকে জোর করে পরাজিত করা হয়েছে। সারাদেশে কারচুপির আলামত পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ব্যালট পেপার পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বলছে যার কাছে ব্যালট পেপার পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। যত্রতত্র ব্যালট পেপার পাওয়ার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেই মামলা হওয়া উচিত। নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। ইনশাল্লাহ আগামিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আবার সরকার গঠন করবে। দলপুনর্গঠনের দাবির জবাবে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, দেশের সকল কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে তৃণমূল থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। কুমিল্লার কমিটির বিরুদ্ধে কারো কোন অভিযোগ থাকলে রাবেয়া চৌধুরীর কাছে জানাবেন। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।

রাজনৈতিক সংবাদ