রুদ্র মাসুদ- আগামিকাল সোমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থগিত হওয়া নোয়াখালী-১ আসনের নির্বাচন। মহাজোটের মহাবিজয়ের পর দেশবাসীর দৃষ্টি এখন এ আসনের দিকে। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বৃহত্তর নোয়াখালীর ১২টি আসনের মধ্যে ৯টি পায় চারদলীয় জোট। এ আসনেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটে, নাকি ক্ষমতার পালাবদলে ভোটারদের রায় বদলে যায় সেদিকে দৃষ্টি সবার। তবে প্রশাসনের দৃষ্টিতে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে চাটখিল ও সোনাইমুড়ী উপজেলা। নির্বাচনের দিন ২০জন ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে থাকবে র্যাব, বিডিয়ার আর পুলিশের ষ্ট্রাইকিং ও মোবাইল টিম। এদিকে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ন করতে প্রাধন নির্বাচন কমিশনের কাছে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন ব্যারিষ্টার খোকন। এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনে শনিবার ব্যস্ত সময় পার করেছেন দুই জোটের দুই প্রতিদ্বন্ধী মহাজোট প্রার্থী এইচ এম ইব্রাহিম এবং চারদলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিষ্টার এ এম মাহবুব উদ্দীন খোকন। দুই জোটের দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যারিষ্টার খোকনের বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলায় আবার এইচ এম ইব্রাহিমের বাড়ি চাটখিল উপজেলায়। তাই জোটের বাইরে আঞ্চলিকতার কারণে দুই উপজেলার মধ্যেও ভোটের লড়াই হচ্ছে বলে ভোটারদের ধারণা। তবে শেষ পর্যন্ত নোয়াখালীর অন্য আসনগুলোর মতো এই আসনেও ফ্যাক্টর হবে ১লাখ ৩৬ হাজার ২৪৩জন মহিলা ভোটার। যার সংখ্যা পুরুষ ভোটের চেয়ে ২৫ হাজার ৭৯জন বেশি। জেলা নির্বাচন অফিস ও পুলিশের বিশেষ শাখা সুত্রে জানা যায়, চাটখিল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-১ আসনের মোট ভোটার হচ্ছে ২লাখ ৪৭ হাজার ৪০৭জন। তন্মধ্যে চাটখিলে ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬জন এবং সোনাইমুড়ীতে ১ লাখ ২২ হাজার ৫১জন। এ আসনের মোট ভোট কেন্দ্র হচ্ছে ১০৫টি। তন্মধ্যে ৫৫৯টি বুথে চাটখিলে ৫৩টি এবং সোনাইমুড়ীতে ৫২টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনের দিন যেকোন ধরণের গোলযোগের আশংকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তন্মধ্যে চাটখিলের ৪৭টি কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে দিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৬জন কনষ্টেবল ১০জন আনসার এবং ১০জন ভিডিপি থাকবে। এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্র মিলিয়ে থাকবে কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশের একটি করে মোবাইল টিম। এছাড়াও ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে থাকবে বিডিআর ও র্যাবের ষ্ট্রাইকিং ফোর্স। প্রার্থীদের শেষ মুহুর্তের প্রচারণা এবং ভোট যুদ্ধ- এ আসনের নির্বাচনকে ঘিরে প্রচরাণায় এগিয়ে রয়েছেন চারদলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিষ্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন। নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পূর্ব থেকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় তিনি প্রচারণা শুরু করেন। পক্ষান্তরে এ আসনে আওয়ামীলীগ থেকে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ স্পাদক গোলাম কুদ্দুসকে পরবর্তীতে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি প্রয়াত কমরেড নুরুল ইসলামকে। তখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন চাটখিল উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এইচ এম ইব্রাহিম এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার রুহুল আমিন। এছাড়া মহাজোটের শরিকদল জাসদ (ইনু) থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন অধ্যাপক হারুনুর রশিদ। পরবর্তীতে নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণার পর বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে জাতীয়পার্টিতে যোগদানকারী এডভোকেট মাহবুবুর রহমান জাতীয় পার্টির থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং আওয়ামীলীগ থেকে এইচ এম ইব্রাহিমকে নৌকা প্রতীক দেয়া হলেও নির্বাচন কমিশনে তা আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয় এইচ এম ইব্রাহিমকে। বুধবার এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এইচ এম ইব্রাহিমের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ান এডভোকেট মাহবুবুর রহমান এবং অধ্যাপক হারুনুর রশিদ। এর আগে গোলাম কুদ্দুস তাঁর প্রার্থীতা প্রত্যাহার এবং খন্দকার রুহুল আমিনও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। যার ফলে ইব্রাহিম মহাজোটভুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের একমঞ্চে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাছাড়া উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রে মহাজোটের ক্ষমতায় থাকার বিষয়টিকে তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রচারনায়। তবে ইব্রাহিমের বাড়ি চাটখিল এবং ব্যারিষ্টার খোকনের বাড়ি সোনাইমুড়ী হওয়ায় এ দুজনের মধ্যে জোটের বাইরেও আঞ্চলিকতার লড়াই হবে। কারণ সোনাইমুড়ী উপজেলা বরাবরই বিএনপির দূর্গ হিসাবে পরিচিত। পাশাপাশি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান বিএনপি ছেড়ে যাওয়ায় তাঁর অনুসারি এবং মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপি নেতা আমনি আহম্মেদ ভূঁঞার সমর্থকরাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ব্যারিষ্টার খোকনের পক্ষে। এছাড়া ভোটারা প্রতীকের বাইরে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা, সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়ার প্রবণতাসহ নানাদিক বিশ্লেষণ করছে এ আসনের নির্বাচনে। এদিকে শেষ মুহুর্তের প্রচারণা অংশ হিসাবে শুক্রবার বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সোনাইমুড়ী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ও চাটখিল পাঁচগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ব্যারিষ্টার খোকনের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হান্নান শাহ এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও গত ক’দিন থেকে খোকনের পক্ষে ভোট চান মানুষের কাছে। গতকাল শনিবার ব্যারিষ্টার খোকন সোনাইমুড়ীতে গণসংযোগ করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যারিষ্টার খোকন সন্ত্রাস নির্মূল, শিক্ষার মান উন্নয়ন, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা, বেকরত্ব দূরীকরণ ও উন্নয়নের বিষয়কে অগ্রাধিকার দেন। অপরদিকে এইচ এম ইব্রাহিমের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নিজে এবং তার পক্ষে সমর্থনদানকারী প্রার্থীরা ব্যাপক প্রচারণা চালান। তারা ২৯ ডিসেম্বরের মহাজোটের বিজয় এবং সরকার গঠনের ফলে এ এলাকায় উন্নয়নের সহায়হক হিসাবে নৌকা মার্কায় ভোট চান। নির্বাচনী প্রচারণা শেষ দিনে গতকাল শনিবার সোনাইমুড়ী কলেজ মাঠে সর্বশেষ জনসভায় অনুষ্ঠিত হয়। সোনাইমুড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মমিনুল ইসলাম বাকেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন একরামুল করিম চৌধুরী এমপি, জেলা আওয়ামীলীগের অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ, সাবেক হুইপ মজিবুল হক, সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুর রহমান বেলায়েত, মোহাম্মদ আলী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কুদ্দুস, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার রুহুল আমিন, সোনাইমুড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান বাহার, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান রোটন প্রমুখ। জনসভায় থেকে উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল করতে ইব্রাহিমকে ভোট দেয়ার আহবান জানান। নির্বাচন নিয়ে চারদলীয় জোট প্রার্থীর শংকা- নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন চারদলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিষ্টার খোকন। তিনি জানান, বিভিন্নস্থানে তাঁর নেতাকর্মীদের হয়রানী করা হচ্ছে। সোনাইমুড়ীর পিতাম্বরপুরে তাঁর একটি নির্বাচনী অফিস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া, আমিরাবাদে প্রচারণার সময় কর্মীদের মারধর, চাটখিলের খিলপাড়া ইউনিয়নের নয়নপুরে নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ করেন প্রতিদ্বন্ধী মহাজোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এসকল ঘটনায় তার ২০জনেরও বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এমন অবস্থায় নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র এবং ভোটারের নিরাপত্তার জন্য তিনি পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রতি জোর দেন। পাশাপাশি নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে তিনি সেনাবাহিনী মোতয়েনের দাবি জানান। এজন্য গতকাল শনিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছেন বলে জানান। নির্বাচন এবং একটি ক্ষত- সারাদেশের মানুষের কাছে আলোচিত নোয়াখালী-১ আসন। এ আসনের মহাজোট প্রার্থী গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি কমরেড নুরুল ইসলাম অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ায় এ আসনটির নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন; যা তিনি মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত বলেছেন। তরুণ ভোটার সামছুদ্দীন (২১) এর মতে নুরুল ইসলামের মৃত্যু এ আসনের জনগণের জন্য একটি ক্ষত। কারণ নির্বাচনই তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসাবে মনে করে চাটখিলবাসী। প্রসাশন বলছে সর্বোচ্ছ ব্যবস্থা নিরাপত্তা থাকবে- নির্বাচনকে ঘিরে চারদলীয় জোট প্রার্থী শংকা এবং সার্বিক নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে রিটার্ণিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুল হক বলেন, নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে সর্বোচ্ছ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ২০জনের মতো ম্যাজিষ্ট্রেট থাকবে দায়িত্ব পালনে। প্রতিটি কেন্দ্রে ২৯ ডিসেম্বরের তুলনায় ৬গুন বেশি পুলিশ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া মোবাইল ও ষ্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব এবং বিডিআর সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ভোটরা অবশ্যই নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে।






