নোয়াখালী-১ আসনে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ : চার দল প্রার্থী ব্যারিষ্টার খোকন নির্বাচিত

রুদ্র মাসুদ- নোয়াখালী-১(চাটখিল-সোনাইমুড়ী) আসনের নির্বাচনে চারদলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিষ্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন জয়ী হয়েছেন। রাত ১২টায় ঘোষিত ফলাফলে ১০৫টি কেন্দ্রেই চারদলীয় জোট প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী মহাজোট প্রার্থী এইচ এম ইব্রাহিম পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬৫৮ ভোট। এদিকে সন্ধ্যায় ফল ঘোষণা শুরু হলে চাটখিল ও সোনাইমুড়ী এলাকার বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা চাটখিল উপজেলার সোমপাড়া বাজারে বিএনপির অফিস ভাংচুর করে। ইয়াসিন হাজীর বাজারে দোকানপাট এবং পহৃর্ব সোসালিয়া ও নোয়াখলা গ্রামের জীবনগর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি সমর্থকদের ওপর হামলা হয়। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার লুৎফুল কবীর জানান, এই ধরনের বিচ্ছিন্ন হামলার খবর তিনিও পেয়েছেন। বিভিল্পæ জায়গায় মোবাইল টিম পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সহিংসতার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন তাদের গ্রেফতার করা হবে। এদিকে শত শংকা আর উ™ে^গ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নোয়াখালী-১ সংসদীয় আসনের ভোটগ্রহণ গতকাল সোমবার শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। নোয়াখালীর চাটখিল-সোনাইমুড়ী এলাকায় ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের নির্বাচন সম্পন্ন হলো। জোট-মহাজোট প্রার্থীদের বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ থাকলেও সাধারণ ভোটার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরো নির্বাচনী এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করলেও ক্ষোভ আর কষ্ট নিয়ে ভোট দিয়েছেন গণতন্ত্রী পার্টির প্রয়াত সভাপতি নুরুল ইসলামের নোয়াখলা গ্রামের মানুষ। ওই এলাকায় ভোটারদের অনেক কম উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার আবদুল হক ভোটগ্রহণ শেষে সমকালকে বলেন, প্রায় ৮০ ভাগ বেশি ভোট পড়েছে (কাষ্ট) হয়েছে । দুপুর ১২টার মধ্যে অধিকাংশ কেন্দ্রে ৫০ ভাগের বেশি ভোট পড়েছে। তিনি বলেন, ‘পুরো নির্বাচনী এলাকায় কোথাও কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। সব জায়গা থেকেই শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ভোটারদের লম্বা লাইনই প্রমাণ করে কোনো ধরনের বাধা বিঘœ ছাড়াই ভোটাররা কেন্দ্রে এসেছেন।’ সকাল ৯টায় সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের বজরা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে হাজির হন মহাজোট প্রার্থী এইচএম ইব্রাহিম। চারদলীয় জোট অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্র এটি। কেন্দ্রে প্রবেশের পরই এইচএম ইব্রাহিম প্রিসাইডিং অফিসার দেলোয়ার হোসেনের কাছে ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তার এজেন্ট ও সমর্থকদের মারধর করা হচ্ছে ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু প্রিসাইডিং অফিসার তার অভিযোগে কর্ণপাত না করলে এ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখার লিখিত আবেদন করেন তিনি। দীর্ঘ এক ঘণ্টার বেশি সময় এ কেন্দ্রে অবস্থান করে ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা তার অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে চলে যান। প্রিসাইডিং অফিসার দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া তিনি ব্যবস্থা নিতে পারেন না। তাই তার পক্ষে ভোটগ্রহণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।’ বেলা সোয়া ১১টায় মহাজোট প্রার্থী এইচএম ইব্রাহিমের নিজ ভোটকেন্দ্র চাটখিলের খিলপাড়া ইউনিয়নের খিলপাড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে যান চারদলীয় জোট প্রার্থী ব্যারিষ্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি কয়েকটি জায়গার নাম উল্লেখ করেন। সেখানে উপস্থিত ম্যাজিষ্ট্রেট নূর-ই-খাজা আলামিন তাকে বলেন, বিভিন্ন এলাকায় টহলের সময় তার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি। বিএনপি নেতাদের ফোন পেয়ে কয়েক জায়গায় গিয়ে তিনি দেখেছেন তাদের অভিযোগ ঠিক নয়। তিনি প্রার্থীকে সুনির্দিষ্ট করে জায়গার নাম বলতে বলেন। এক পর্যায়ে জায়গার নাম না বলতে পেরে চলে যান মাহবুব উদ্দিন খোকন। যাওয়ার সময় তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবেই হচ্ছে। তবে ধীরগতিতে ভোট নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে চাটখিলের শংকরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল মহিলা ভোটারদের লম্বা লাইন। খুবই ধীরগতিতে চলছে ভোটগ্রহণ। ওই সময় পর্যন্ত ২ হাজার ৮৫১ জন ভোটারের মধ্যে সাড়ে ৮ শ’ ভোট কাষ্ট হয়েছে। ধীরগতিতে ভোট নেওয়া প্রসঙ্গে প্রিসাইডিং অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রায় ৩ হাজার ভোটারের এ কেন্দ্রে বুথ মাত্র ৫টি। কক্ষ ৩টি। এত কম জায়গায় ভোট নিতে সমস্যা হচ্ছে তাদের। তাছাড়া অধিকাংশ মহিলাই ভোটার নম্বর ছাড়া কেন্দ্রে এসেছেন। ফলে তাদের নাম খুঁজে পেতে সময় লাগছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে বলে আশা করেন তিনি। চাটখিল পৌরসভার মধ্যে ভীমপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কারিগরি কলেজ কেন্দ্রে কথা হয় নোয়াখালীর পুলিশ সুপার লুৎফুল কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে অযাচিত কোনো লোক কেন্দ্রে আসতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি রাস্তায় চলছে চলছে র‌্যাব, বিডিআর ও পুলিশের কড়া টহল। ফলে রাস্তার মধ্যে ভোটারদের বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, অভিযোগ করতে হয়, তাই প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন।

এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৭৯০ জন। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ৫০ ভাগ ভোট কাষ্ট হয়েছে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা সুন্দুরপুর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক উল্যাহ (৭৪) জানান, নুরুল ইসলামের মৃত্যুকে ঘিরে এ আসনের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ায় ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে শংকিত ছিলাম। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে এসে সে ধারণা পাল্টে গেছে। এ কেন্দ্রে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২ হাজার ৯৯৪টি ভোট পড়ে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার নাজমুল হাসান খন্দকার। সকাল ১০টায় সোনাইমুড়ী উপজেলার নওয়াবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটারদের লল্ফ^া লাইন। বৃদ্ধ নুরুল হক ভ‚ঁঞা (৭৪) জানান হয়তো এটাই তার সর্বশেষ ভোট। লাঠিতে ভর দিয়ে নিজেই এসেছেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। এ কেন্দ্রে তখন ৬ শ’রও বেশি মহিলা ভোটারকে লাইনে অপেক্ষমাণ থাকতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে সকাল ৮টা থেকে সন্তান কোলে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রহিমা আক্তার (৩২)। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে হলেও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পারছেন, এতেই তিনি খুশি। এত নিরাপত্তার পরও চাটখিলের নোয়াখলা ইউনিয়নের সিংবাহুড়া গার্লস একাডেমী কেন্দ্রে বেলা ১১টার দিকে রিকশায় ভোটারদের কেন্দ্রে আনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে বিএনপি সমর্থকদের বাঁশের কঞ্চির আঘাতে আওয়ামী লীগ সমর্থক খোরশেদ মোল্লার চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নোয়াখলার জীবনগর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দেখা গেল দু’জন মহিলা ভোটার বসে আছেন। তাদের অভিযোগ, আগেই তাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। প্রিসাইডিং অফিসার ফিরোজ আলম চৌধুরী বলেন, ‘এ এলাকায় অধিকাংশ মহিলা ভোটারই বোরখা পরে ভোট দিতে এসেছেন। এছাড়া তালিকায় থাকা ছবিও ঝাপসা। ফলে বিচ্ছিন্নভাবে দু’একজন ভুল করে অন্যের ভোট দিয়ে থাকতে পারে।’ তবে বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন বলে জানান। সোনাইমুড়ীর সোনাপুর আলি আকবর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুর ১২টায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে আগে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ কারণে ওই কেন্দ্রে ১০ মিনিট ভোটগ্রহণ বল্পব্দ থাকে। উল্লেখ্য, চাটখিল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-১ সংসদীয় আসনের মোট ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪০৭ জন। এ আসনের মোট ভোটকেন্দ্র ১০৫টি এবং বুথের সংখ্যা ৫৫৯টি। নির্বাচনে ১০৫ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৫৫৯ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ১ হাজার ১১৮ জন পোলিং অফিসার ভোটগ্রহণের দায়িত্ব পালন করেন।

 

 

 

 

রাজনৈতিক সংবাদ