রুদ্র মাসুদ- অভ্যন্তরীন কোন্দল আর গ্রহণযোগ্য নেতার অভাবেই নোয়াখালীতে পারছে না আওয়ামী লীগ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামী লীগের জয়-জয়কার হলেও বৃহত্তর নোয়াখালির ১৩টি আসনের মধ্যে ১১টিতেই পরাজিত হয়েছে মাহাজোট প্রার্থীরা। এমনকি বিশাল জয় নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও সর্বশেষ সোমবারের নির্বাচনে চাটখিল-সোনাইমুড়ির এলাকার মানুষ ধানের শীষের পক্ষেই রায় দিয়েছে। বারবার প্রার্থী বদল, প্রার্থীর নিজের ইমেজ না থাকা আর স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিরোধের কারণেই মহাজোট প্রার্থী পারাজিত হয়েছেন বলেই মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এই নির্বাচনে চারদফায় প্রার্থী বদল করেছে আওয়ামী লীগ। তাছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জনসভা করে গেলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা তো দহৃরের কথা স্থানীয় নেতারাও মাঠে নামেননি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে। আর এসবের প্রভাব পড়েছে সোমবারের নির্বাচনে। শুধু চাটখিল-সোনাইমুড়ি নয়, বৃহত্তর নোয়াখালির চিত্র একই। এই এলাকায় আওয়ামী লীগের কোন নেতাই অন্য নেতাদের উপরে উঠতে দিতে চান না। একমাত্র ওবায়দুল কাদের ছাড়া কেন্দ্রীয় কোন নেতাও নেই এই এলাকায়। তিনিও নোয়াখালিতে শুধু নিজের জন্য রাজনীতি করেন। অন্য নেতাদের সঙ্গেও তেমন সম্পর্ক নেই তার। ফলে স্থানীয় নেতারা একজন অন্য জনের পেছনে লেগে আছেন। নোয়াখালি সদর আসন থেকে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর পক্ষে কেন্দ্রীয় কোন নেতাকেই নামতে দেখা যায়নি। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাও নামেননি তার পক্ষে। সে সময় ক্ষুব্ধ এই নেতা শেষ পর্যন্ত তরুন নেতাদের সাথে নিয়ে নির্বাচন করে জিতেছেন। ২২ বছর পর এক সময়ের আওয়ামী লীগের ঘাঁটি এ আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। সোমবার অনুষ্ঠিত নোয়াখালী-১ আসনের নির্বাচনেও দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের গা ছাড়া ভাব। সোনাইমুড়ী উপজেলায় মহাজোট প্রার্থী এইচ এম ইব্রাহিম নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার রুহুল আমিন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সেনাইমুড়ী এখানকার অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতাই ছিলেন তাঁর পক্ষে। এছাড়া সোনাইমুড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ স¤ক্সাদক আ ফ ম বাবু উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে এবং সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান বাহার ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়া কর্মী সমর্থকরা তাদের পক্ষে প্রচারণায় ব্যস্টø ছিলেন বেশি। সংসদ নির্বাচনে মাঠে নামেননি তারা। নিজের পরাজয় সম্পর্কে মহাজোট প্রার্থী এইচ এম ইব্রাহিম গতকাল সমকালকে বলেন, নির্বাচনের ৬দিন আগে ৫ জানুয়ারি নৌকা প্রতীক বরাদ্দের চিঠি হাতে পেয়েছেন। যার ফলে প্রতিটি ভোট কেন্দ্র এলাকায় প্রয়োজন মতো পো®দ্বারও পাঠানো যায়নি। এছাড়া কম সময়ের কারণে প্রতিটি ওয়ার্ডে তো দুরের কথা সবগুলো ইউনিয়নেও ঠিকমতো যেতে পারেননি তিনি। প্রতীক বরাদ্দের পর ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেয়ে নেতাদের ‘কনভিন্স’ করতেই সময় বেশি ব্যয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই আসনে নির্বাচন করার জন্য সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরা®দ্ব্র প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার রুহুল আমিনকে বলেছিলেন। সেই থেকে মাঠে নামেন তিনি। সারাদেশে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কুদ্দুস। পরে ১৪ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি নুরুল ইসলামকে। তার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়া গত দুই বারের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মহবুবুর রহমানকে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যায়। মহাজোটের প্রার্থী ঘোষনা দিয়ে তিনি কাজও শুরু করেন। প্রতীকও পান লাঙ্গল। আর তখন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এইচ এম ইব্রাহিমকে। এরকম টানাপোড়েনের মধ্যে নির্বাচন করেছেন মহাজোট প্রার্থী। ফলে পরিনতি যা হওয়ার তাই হয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম কুদ্দুস গতকাল বলেন, নির্বাচনে জিততে হলে দলীয় প্রতীকের বাইরের প্রার্থীর নিজের ইমেজ থাকতে হয়। জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে চলাফেরা করতে হয়। কিন্তু এসব গুনাবলীর কোনটিই ছিল না আমাদের প্রার্থীর। ফলে পরাজিত হতে হয়েছে আমাদের। এইচ এম ইব্রাহিম যেনো নৌকা প্রতীক না পান সেজন্য আপত্তি জানিয়েছেন মনোনয়ন বঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার রুহুল আমিন। সোনাইমুড়ী উপজেলার অধিকাংশ নেতাই তাঁর পক্ষে ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য যে ৫দিন সময় পাওয়া গেছে তাতে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যেতে পারেনি প্রার্থী। ভোটারদের মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনে শুধুমাত্র চাটখিল উপজেলা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৩ আসনে ২২ হাজার ৪’শ ভোটের ব্যবধানে হেরেছিলেন আওয়ামীলীগ প্রার্থী মাহমুদুর রহমান বেলায়েত। এবারের নির্বাচনে চাটখিল উপজেলায় এইচ এম ইব্রাহিম চারদলীয় জোট প্রার্থী থেকে কম পেয়েছেন ২ হাজার ৬১ ভোট। অন্যদিকে সোনাইমুড়ীতে কম পেয়েছেন ২২ হাজার ৬৬১ ভোট। সোনাইমুড়ীতে এমনটি ঘটেছে আওয়ামীলীগ নেতাদের কারণেই। মহাজোট প্রার্থীর পক্ষে নোয়াখালীর বাইরে থেকে যে ক’জন নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন তাদের একজন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার। তিনি সমকালকে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় ঘাটতি ছিলো। এছাড়া চারদলীয় জোট প্রার্থী বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চেয়েছেন, যা মহাজোট প্রার্থীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ৯৬’র আওয়ামীলীগ সরকারের সাফল্য, ২০০১ সালের চারলীয় জোট সরকারের ব্যর্থতা কিংবা এবারের নির্বাচনী ইস্তেহারের যে দিকগুলো রয়েছে তা ভোটারদের কাছে পৌঁছতে পারেনি দলীয় নেতা-কর্মীরা। এজন্যই ফলাফল তাদের পক্ষে যায়নি। তবে তিনি চারদলীয় জোট প্রার্থীর পক্ষে কালো টাকা ছাড়ানোর অভিযোগ করেন। নোয়াখালী, ফেনী এবং লক্ষ্মীপুর নিয়ে বৃহত্তর নোয়াখালীর ১৩টি আসনের মধ্যে ২৯ ডিসেম্বর ১২টি আসনে নির্বাচন হয়। চারদলীয় জোট ৯টি আসনে জিতে এবং ১টিতে জিতে বিএনপির মনোনয়ন বাঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন। অপর দু’টি জেতে মহাজোট প্রার্থীরা। স্থগিত হওয়া নোয়াখালী-১ আসনের নির্বাচনেও জিতলো চারদলীয় জোট প্রার্থী। ফেনীর এবং লক্ষ্মীপুরের সবক’টি আসনই জিতেছে চারদলীয় জোট। নোয়াখালীর একটিতে ওবায়দুল কাদের ও আরেকটিতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী জিতেছেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জাসদের আওয়ামীলীগ বিরোধী প্রচারণার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এখানে গড়ে ওঠা আওয়ামীলীগ বিরোধী ভোট ব্যাংক যেমন চারদলীয় জোটের পুঁজি তেমনি আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে দলকে সংগঠিত করে জনমত তাঁদের পক্ষে নিতে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ‘৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে মুক্তিযুদ্ধকালীণ সময়ের বৃহত্তর নোয়াখালীর বিএলএফ কমান্ডার মাহমুদুর রহমান বেলায়েতকে সভাপতি করা হয়। মন্ত্রীর মর্যাদায় সংবর্ধনা দিয়ে তাকে বরণও করেন নেতাকর্মীরা। কিন্তু দলীয় কোন্দল না কমে বরং বেড়ে যায় বহুগুনে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি অনেকটাই নিরবে কেটে পড়েন। সে সময়ে পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ। সাথে তরুণ নেতা একরামুল করিম চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কিন্তু কোন্দলের রেশ থেকে যায় জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে একশ্রেণীর নেতারা চলে যায় বিএনপির পকেটে। তবে শেষ পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে একরামুল করিম চৌধুরী ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হলেও জেলার ৪টি আসনেই আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়। নোয়াখালীতে আওয়ামীলীগের ভরাডুবির অন্যতম কারণ হচ্ছে দলীয় মনোনয়ন। নির্বাচনের পহৃর্বে যিনি জনপ্রিয় তাকে মনোনয়ন দেয়া হয় না। আবার যাকে মনোনয়ন দেয়া হয় মনোনয়ন বঞ্চিতরা তাঁর পক্ষে কাজ করেন না। কেউ কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করে থাকেন। এবারের মতো বিগত নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। পাশাপাশি আওয়ামীলীগের প্রথম কাতারে থাকা অধিকাংশ নেতা জনবিচ্ছিন্ন হলেও বছরের পর বছর তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু কারো বিরুদ্ধেই কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় হয় না।






