মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে প্রান্তের ভাবনা : যতো আক্রোশ গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর !
-রুদ্র মাসুদ-
13আজ বিশ্ব মুক্ত সাংবাদিকতা দিবস। ওয়ার্ল্ড প্রেস প্রিডম ডে নামেই আমাদের দেশে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দিনটি পরিচিত। এ বছর দিনটি বাংলাদেশের সাংবাদিক তথা গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছি। গত ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় নিজ বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির নৃশংস হত্যাকান্ডের পর আমাদের সাংবাদিক সমাজের টনক নড়েছিলো। নিজ পেশা সম্পর্কে দীর্ঘদিন পর এবং নিজেদের টলটলায়মান অবস্থান সম্পর্কে হঠাৎ করেই আমাদের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ নড়েচড়ে উঠেন। সোচ্চার হয়ে উঠেন সাংবাদিক হত্যা নির্যাতন প্রতিরোধে। এ অবস্থার মধ্যেই সরকার প্রধানের বেডরুমের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উক্তি সাংবাদিক নির্যাতনের মাত্রাকে যেনো উস্কে দেয়। যেনো সকল আক্রোশ সাংবাদিকদের ওপর।
এ লেখাটি নিয়ে গত ক’দিনের প্রস্তুতি থাকা স্বত্তে¦ও লিখা হয়ে উঠছিলো না। কোথাও যেনো পিছুটান তাড়া করছিলো। ২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মহান সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারি দলের মাননীয় সংসদ সদস্যদের সংবাদ মাধ্যম সম্পর্কে বিষোদগার আর এ সম্পর্কে একটি শীর্ষ দৈনিকে প্রবীন সাংবাদিক এ11 বি এম মুসার লেখা “ কার অছিলায় সিন্নি খাইলা মুন্সি চিনলা না’’ বিশেষ নিবন্ধটি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠে। সাগর-রুনি’র নৃসংশ হত্যাকান্ডের পর সারাদেশে সম্ভবত নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত হিসাবে প্রথম সমকালে আমার ‘আর কত কান্না চেপে রাখবো’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়। প্রায় তিন মাস হতে চললেও সেই কান্নার রেশ কাটেনি এখনো। সবমিলিয়ে মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য এই স্বাধীনদেশে আর কত চোখের জল ফেলতে হবে সেই প্রশ্ন জাগতে থাকে মনের ভেতর। আর কতো সাংবাদিকের রক্তের বিনিময়ে নিরাপদ সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরী হবে আমাদের দেশে?
৩ মে মুক্ত সাংবাদিকতা দিবসকে সামনে রেখে পেছনের এক বছরে সারাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। আর এ চিত্রটি জানতে দ্বারস্থ হয়েছিলাম মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্রের কাছে। সবিনয় অনুরোধটি রক্ষা করে দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা এবং ইংরেজী দৈনিকগুলো মারফত প্রাপ্ত যে তথ্য তাঁরা সরবরাহ করেছেন তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। এবং ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে সে চিত্র আরো ভয়াবহ। ২০১১ সালে সারাদেশে খুন হয়েছে ১জন সাংবাদিক আর ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত খুন হয়েছেন দুইজন সাংবাদিক। ২০১১ সালে সারাদেশে হত্যা, হত্যার হুমকি, নির্যাতন, মামলা, বোমা হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩০৬জ সাংবাদিক। অথচ ২০১২ সালের প্রথম তিন মাসেই এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৮ জনে। সাংবাদিক নির্যাতনকারী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে রয়েছেন আইনশঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার দল এবং সান্ত্রাসী। বাদ যায়নি বিএনপিও।
নানাভাবে হুমকি ধামকি এবং নির্যাতন চলছেন। সর্বশেষ পহেলা বৈশাখে সহরোয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত পুলিশের নিয়ন্ত্রন কক্ষে তথ্য চাইতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সাংবাদিক প্রহৃত হয়েছেন পুলিশের হাতে এবং ইলিয়াস আলীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ারকে হুমকি দেওয়া হয়েছে অফিসের পিএবিএক্স এ ফোন করে। এরকম একটি অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যেই আজ আমরা পালন করবো বিশ্ব মুক্ত সাংবাদিকতা দিবস।
12সাংবাদিক মুসা ভাই’র নিবন্ধটির বিষয়ে চোখ ফেরাতে চাই। স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং এর পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা ছিলো সাংবাদিকদের। দেশের সামগ্রিক কল্যাণ তথা ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন সংবাদমাধ্যম। সর্বশেষ ১/১১’র পরবর্তী সময়ে অনিশ্চিত শাসন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে আমাদের গণমাধ্যম। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের এই ভূমিকার ওপর চড়ে আমাদের রাজনৈতিকদলগুলো পার হন নির্বাচনী বৈতরনী। ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার পথে তাঁরা পরম আদরে প্রসংশা বিলিয়ে দেন গণমাধ্যমের প্রতি। কিন্তু পরবর্তী সময়েই বেমালুম ভুলে যান পেছনের কথা।
সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্রমাগত প্রতিশ্রুতিও আমাদের নিরাপদ সাংবাদিকতার পরিবেশকে নিশ্চিত করতে পারেনি। উপরন্তু আরো হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে পরবর্তীতে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানীর ঘটনাগুলো। একই সাথে আমাদের বিরোধীদলকেও দেখা যায়নি সাংবাদিকদের পাশে এসে কার্যকর কর্মসূচী দিতে। অথচ গত তিন বছরে বিরোধীদলের প্রতিটি যৌক্তিক কর্মসূচীতে আমাদের গণমাধ্যম তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু হুমকি হামলা মুখোমুখি হয়েছি আমরা বিএনপির দিক থেকেও । সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল নোয়াখালীর শহরে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় আক্রান্ত হয় নোয়াখালী প্রেসক্লাব। বিএনপির একাংশ প্রেসক্লাবে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।
সরকারি দল এবং বিরোধীদলের একই চেহারা দেখে বারবার মনে হয় যতো আক্রোশ যেনো গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি। পরিবেশিত সংবাদ নিজেদের পক্ষে গেলো তো ভালো,  না হয় দুই দলের চেহারাই একই রকম হয়ে উঠে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রান চাই। মুক্ত সাংবাদিকতা দিবসে তাই মুক্ত সাংবাদিকতার নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তার দাবি তুলবো। প্রান্ত থেকে এ আওয়াজ উঠুক কেন্দ্র পর্যন্ত।
#
-লেখক : সাংবাদিক