নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সাংসদ একরামের অব্যহতিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র : দশ দিনের আল্টিমেটাম, নাহলে গণপদত্যাগ, দলীয় কার্যালয়ও দশ দিন বন্ধ থাকবে
11
রুদ্র মাসুদ,
চলমান নোয়াখালী ডট কম-
নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী এমপি দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি চাওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জেলা শহরে দলীয় কার্যালয় এবং যানবাহন ভাংচুর, রাস্তায় অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধ করেছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত জেলা শহরের সোনাপুর, দত্তের হাট, মাইজদীবাজার ও শহরের প্রধান সড়ক রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসময় জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের চেয়ার ও আসবাবপত্র ভাংচুর করে রাস্তায় নিয়ে আগুন এবং ১০/১২টি যানবাহন ভাংচৃর করে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভকালে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা যোগাযোগ ও রেল মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধেও শ্লোগান দেয়।
এক পর্যায়ে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে একরামুল করিম চৌধুর এমপি বিক্ষোভ থামাতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে পৌঁছলে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের সামনের সড়ক। এসময় তিনি ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশ দেন। একই সাথে সরকারি দলের নেতাকর্মী হওয়ায় যে কোনো ধরণের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী থেকে বিরত থাকা নির্দেশ দেন। একই সাথে আগামি ১০দিন জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়  এবং দলীয় কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে তিনি জানান।
একরামুল করিম চৌধুরী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, যারা দিনে আওয়ামীলীগ রাতে বিএনপি করতো তাঁদের12 কবল থেকে আওয়ামীলীগকে উদ্ধার করে আজ দলকে এ পর্যায়ে এনেছি। আজ হাজার হাজার নেতাকর্মী আওয়ামীলীগের পতাকাতলে কাজ করছে। অথচ কেন্দ্র আশানুরূপ সাড়া মিলেনি। উপরন্তু নানাভাবে কুৎসা রটানো হয়েছে।
ধানমন্ডি থানার ওসি মনিরুজ্জামান আমার (সাংসদ একরাম) সাথে যে আচরণ করেছে, দীর্ঘ তিন মাসেও এর বিচার পাইনি। নোয়াখালীর নেতাকর্মীরা সংযম দেখিয়েছে। এজন্য জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছে। জেলা আওয়ামীলীগের নেতারাও অব্যাহতি চেয়েছে। এসব অব্যাহিত পত্র ঢাকায় দলের কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে পাঠানো হবে। আগামি ১০ দিনের মধ্যে অব্যাহতির বিষয়ে কোনো সুরাহা না হলে সবাই গণপদত্যাগ করবে। এই ১০দিন জেলা আওয়ামীলীগের কার্যালয় খুলবে না এবং দলীয় কার্যক্রমও বন্ধ থাকবে। আমরা (নেতাকর্মীরা) বিএনপি অন্যকোনো দলে যাবো না, প্রয়োজনে আমরা আগামি নির্বাচন বয়কট করবো।
সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী শেষে সড়ক অবরোধ তুলে নিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করে দেওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিলে সন্ধ্যায় জেলা শহরের যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
আওয়ামীলীগ সুত্রে জানা যায়, গত ২৩ মার্চ ঢাকায় এমপি হোস্টেলে সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীর মেয়ে জারিন তাসনিম চৌধুরী আমরিনের সাথে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৪৮ নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার প্রয়াত আওয়ামীলীগ নেতা এম এ সাত্তার ভূঁঞার ছেলে ব্যারিষ্টার আহসান হাবিব ভূঁঞার বিবাহ উত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। রাত আড়াইটার দিকে বরের ধানমন্ডির বাসায় আতশবাজি পোড়ানোর ঘটনায় ধামনন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান সাংসদ একরামের মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে ধরে থানায় নিয়ে যান। এ ঘটনায় সাংসদ একরাম থানায় ছুটে গেলে ওসি মনিরুজ্জামান তাঁর সাথে অশোভন আচরণ করেছিলেন। এনিয়ে ওসি মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিন মাসের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী কিন্তু দীর্ঘ তিনমাস অতিবাহিত হওয়ার পরও ওসির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত ১৭ জুন নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিমের কাছে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দেয়।
বৃহস্পতিবার বিকালে নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে সাংসদ একরামের অব্যাহিত পত্র নিয়ে 13বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দলীয় পদ থেকে সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীর অব্যাহতি নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিকাল ৩টার দিকে হঠাৎ করেই জেলা শহরের সোনাপুর, দত্তের হাট ও মাইজদী বাজারে সড়ক অবরোধ করে রাস্তার ওপর টায়ার জ্বালিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শণ করতে থাকে দলীয় নেতাকর্মীরা। দত্তের হাট ও সোনাপুরে ৮টি গাড়ি এবং মাইজদী বাজার এলাকায় ৩টি গাড়ি ভাংচুর করে বিক্ষুব্ধ নেতকর্মীরা।
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে ঢুকে সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী ছাড়া বর্ধিত সভা আহবান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শণ করে এবং দলীয় কার্যালয়ে চেয়ার ও আবসাবপত্র ভাংচুর করে। পরবর্তীতে তাঁরা আওয়ামীলীগ কার্যালয় থেকে চেয়ার এনে রাস্তার ওপর আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় দমকল বাহিনী আগুন নেভাতে গেলেও বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের ধাওয়ার মুখে পিছু হটে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইবনে ওয়াজেদ ইমন ও সাধারণ ফজলুল হক সুজনের নেতৃত্বে জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের সামনে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করে। এসময় আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতকার্মীরাও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। বিক্ষোব্ধ নেতাকর্মীদের যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে দেখা যায়।
এসময় জেলা শহরের প্রধান সড়কের বিপুল সংখ্যক পুলিশ থাকলেও বিক্ষোভকারীদের নিৃবৃত্ত করতে পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।
খবর পেয়ে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের সামনে পৌঁছলে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে জেলা শহরের প্রধান সড়ক। এসময় নেতাকর্মীদের ভীড় ঠেলে তিনি দলীয় কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে বক্তব্য রাখেন। এসময় আওয়ামীলীগ নেতাদের মধ্যে আব্দুল মমিন বিএসসি, মাওলা জিয়াউল হক লিটন, হাজী ইউসুফ আলী সেলিম, সামছুদ্দিন জেহান, জেলা যুবলীগের আহবায়ক ইকবাল করিম তারেক প্রমুখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা নেতৃবৃন্দের পদত্যাগ ও কার্যক্রম বন্ধ-
এদিকে জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয় থেকে প্রেরিত প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীর সাথে ওসি মনিরুজ্জামানের অশোভন আচরনের বিচার না হওয়া ও এনিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরে কার্যকর পদক্ষেপন না নেওয়ার প্রতিবাদে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহত চেয়ে সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীর দেওয়া পত্র নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে এক বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বর্ধিত সভায় ওসি মনিরুজ্জামানের অশোভন আচরণ এবং এ নিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের রহস্যজনক নিরবতা এবং সাংসদ একরাম সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিলের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ওসি মনিরুজ্জামানের বিচার এবং মিথ্যা গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রত্যাহার করা না হলে নোয়াখালী জেলা, সকল ইউনিট এবং সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে পদত্যাগ এবং সংগঠনের সকল কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সভায়।
14
চলতি সংবাদ