কোম্পানীগঞ্জে কিশোর মিলন হত্যার এক বছর : টেঁয়ার লোভ করি ন, একদিন বিচার হামু
11
রুদ্র মাসুদ,
চলমান নোয়াখালী ডট কম-
আঁর হুত ত চোর অ আছিলো না ডাকাইতও আছিলো না, পুলিশ চুলের মুডা ধরি গাড়িত্তুন নামাই দিছে আঁর হুতেরে মারি হালাইতো। মাইনসে পুলিশের সামনে মিলনের হিডি মাইচ্ছে, পুলিশ ধরে অ ন। আঁরে টেঁয়া দিতে চাইছে, লই ন। অন হুইনছি হেই পুলিশেগো চাকরি অ অইগেছে। যারা পুলিশের পক্ষ অই টেঁয়া দিতে চাইছে, তারা অন কয়- টেঁয়া দিতে চাইছে টেঁয়া লয় ন, অন বুজি বিচার অইবো। কান্না জড়িত কন্ঠে ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন গত বছরের ২৭ জুলাই নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের সহায়তায় নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা ১৬ বছরের কিশোর সামছুদ্দিন মিলনের মা কহিনুর বেগম।
তবে; ছেলের হত্যার বিচার প্রসঙ্গে মা কহিনুর জানালেন- এক বোচর অই গেছে বিচার হাই ন। টেঁয়ার লোভ করি ন, আলøার বিচার থাইকলে একদিন বিচার হামু।
আলোচিত এই হত্যা মামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও মিলনের মায়ের দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা দুই ব্যক্তি এবং গ্রেফতারকৃত সাতজনই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। তাৎক্ষণিক হত্যাকান্ডের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া গেলেও বিভাগীয় তদন্ত শেষে অভিযুক্ত চার পুলিশের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদেরকে স্বপদে বদলী করা হয়েছে। এ অবস্থায় সারাদেশের আলোচিত এই হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্ত নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
নিহত মিলনের পরিবার এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ২৭ জুলাই সকালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া ইউনিয়নের টেকের বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে প্রকাশ্যে পুলিশের সহযোগীতায় মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁর মা কহিনুর বেগম বাদী হয়ে ৩ আগষ্ট নোয়াখালীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। ১১ আগষ্ট মামলাটি নোয়াখালী ডিবি পুলিশের স্থানান্তর হবার পর প্রথম দিকে ডিবি পুলিশ বেশ তৎপরতা দেখায়। মিলন হত্যাকান্ডের ভিডিও ফুটেজ দেখে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী ডিবি পুলিশের ওসি বিল্লাল হোসেন অল্প ক’দিনের মধ্যে ৭জনকে গ্রেফতার করেন। তন্মধ্যে কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া গ্রামের আব্দুর রবের পুত্র শাহআলম (২০) নোয়াখালীর বিচারিক হাকিমের আদালতে নিজের জড়িত থাকাসহ ঘটনা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও প্রদান করেন। স্বীকারোক্তিতে হত্যাকান্ডে ১৯জনের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে শাহআলম। এছাড়া ভিডিও চিত্র দেখে মিলনকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা ছাড়াও ২৯জনকে সনাক্ত করে ডিবি পুলিশ। পাশাপাশি পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে মিলনকে পিটিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করলেও কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে গ্রেফতারের সংখ্যা আর বাড়েনি, মামলার তদন্তের অগ্রগতিও এক পর্যায়ে থেমে যায়। এক বছর পার হতে চললেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চার্জশীট দেননি।
এদিকে হত্যাকান্ডের পরপরই নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব রশিদ, সহকারি পুলিশ সুপার আলী হোসেন এবং নোয়াখালীর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিল্লাল হোসেনের সমন্বয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি হত্যাকান্ডে পুলিশের সহায়তার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ওসি রফিক উল্যা, এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা’র বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। বরখাস্ত করায় চার পুলিশ সদ্যস্যকে।
এনিয়ে ওসি রফিক উল্যাহর বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তরে এবং এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল 13আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা’র বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। তন্মধ্যে ওসি রফিক উল্লাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি তদন্তের দায়িত্বপান ফেনী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) আবু আহম্মদ আল মামুন এবং এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা’র বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত করছেন হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তার হোসেন।
কিন্তু পুলিশের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে কিশোর মিলনকে প্রকাশে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় সবার অগোচরেই। এমনিক তাদেরকে স্ব-স্ব পদে বহাল করে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি যিনি অভিযুক্ত বলে চিহ্নিত পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আকরাম শেখকে বদলি করা হয় একই জেলার সেনবাগ থানায়। আর ওসি রফিক উল্লাহকে সিলেট রেঞ্জ থেকে প্রায় দুই মাস আগে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে বদলি করা হয় চট্টগ্রাম রেঞ্জে। তিনি বর্তমানে রাঙ্গামাটি সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) পদে কর্মরত। এ ছাড়া বাকি দুই কনষ্টেবল আবদুর রহিমকে চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়িতে এবং হেমারঞ্জন চাকমাকে চাটখিল থানায় বদলি করা হয়েছে।
উদ্বুত পরিস্থিতি চাঞ্চল্যকর মিলন হত্যা মামলার ভবিষ্যত এবং তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই জেলায় বদলীর কারণে মামলার তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশংকা করছেন মিলনের মা কহিনুর বেগম।
মিলনের মায়ের দায়ের করা মামলার আইনজীবি এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন বাবুল  বলেন, মামলাটি ডিবি স্থানান্তরিত হওয়ার পর ব্যাপক অগ্রগতি হয়। সাতজনকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তুমাত্র কিছু দিনের মধ্যেই থেমে যায় সবকিছু। প্রায় এক বছর হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশীট দিতে পারেনি কোর্টে। বর্তমানে এ মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের তদন্তেই্ মিলন হত্যাকান্ডের সাথে চার পুলিশ সদস্যের 14সংশ্লিষ্টতার প্রামন পাওয়া গেছে। অথচ তাদের আবার স্ব স্ব পদে বদলী করা হয়েছে, তন্মধ্যে এ জেলায়ই তিনজনেকে বদলী করায় মামলার তদন্ত প্রভাবিবত হবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের ভূমিকার কারণে এ মামলার ভবিষ্যত এখন অন্ধকার।
এ প্রসঙ্গে মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিল্লাল হোসেন বলেন, মামলা চার্জশীট শীঘ্রই দেওয়া হবে। এতে ২৮/২৯জন আসামী হতে পারে। কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিন পুলিশের বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাতিয়া থানার ওসি মোক্তার হোসেন  বলেন, তদন্ত শেষ করে পুলিশ সুপারের নিকট রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি প্রমানিত হওয়ায় রিপোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করা হয়েছে। যার অংশ হিসাবে তাঁদের বেতন বাড়বে না, প্রমোশনও বন্ধ থাকবে।
পুলিশ সুপার হারুনুর রশিদ হাযারী বলেন, তাঁর কার্যালয়ের বিভাগীয় মামলার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদেরকে স্ব স্ব পদে অন্যত্র বদলী করা হলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে এসআই আক্রাম উদ্দিন শেখের প্রমোশন বন্ধ থাকবে, বাকী দুই পুলিশ সদস্যের ইনক্রিমেন্টও বন্ধ থাকবে। তাছাড়া তদন্তে প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নেই।
ডিবি পুলিশে হাতে গ্রেফতারকৃত এবং মিলনের মায়ের দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখিত দুইজনই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছে জানান পুলিশ সুপার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- মিলনকে পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় লোকজন, পুলিশ নয়। পুলিশ সদস্যরা তাঁকে তখন উদ্ধার করেনি এটা তাঁদের দোষ। কিন্তু সবাই শুধু পুলিশকে দোষ দেয়।
মিলন যেভাবে বর্বরতার শিকার-
ষোল বছরের কিশোর সামছুদ্দিন মিলন। প্রবাসী পিতার চার ছেলের মধ্যে সবার বড় সে। দুরসম্পর্কের খালাতো বোন চুমকিকে পছন্দ মিলনের। তাই গত ২৭ জুলাই সকালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরফকিরা গ্রামের নিজবাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দুরে চর কাঁকড়া ইউনিয়নের বেপারী স্কুলে পড়–য়া চুমকিকে এক নজর দেখতে গিয়েছিলো। মিলন জানতো না ভোর থেকে এই এলাকায় ডাকাত সন্দেহে কয়েকজন গণপিটুনীতে মারা হয়েছে। এমনকি কিছুক্ষণ পরই গণপিটুনীর শিকার হয়ে মরতে হবে তাঁকেও ।  
সকাল ৯টায় স্থানীয় লোকজন আটক করে মিলনকেও। উত্তেজিত জনতাকে খালাতো বোন চুমকির সাথে দেখা করতে এসেছে, একথা বলার পর তারা চুমকিকে বিদ্যালয় থেকে ডেকে এনে একথার প্রমানও পায়। তারপরও চলে মারধর। এক পর্যায়ে এক পর্যায়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন এবং ইউপি সদস্যা ফেরদৌস আরা বেগম মায়ার স্বামী নিজাম উদ্দিন মানিকসহ স্থানীয় লোকজন খবর দিয়ে ডেকে এনে কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই আক্রাম উদ্দিন শেখের হাতে জীবত অবস্থায় তুলে দেওয়া হয় মিলনকে।
উদ্ধারের পর একই ইউনিয়নের টেকের বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে মিলনকে জনতার হাতে তুলে দেয় কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা। সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশের লেলিয়ে দেওয়া উম্মত্ত বখাটেরা মধ্যযুগীয় কায়দায় নৃশংশভাবে পিটিয়ে হত্য করে মিলনকে। মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর টেনে হেঁচড়ে পুলিশের গাড়িতে আবার তুলে দেওয়া হয় মিলনের লাশ। অতপরঃ পুলিশের ভাষ্য-গণপিটুনীতে ডাকাত মারা গেছে, যার নাম সামছুদ্দিন মিলন। ২৭ জুলাই কোম্পানীগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলায় আসামীও করা হয় তাঁকে।
সড়ক দূর্ঘটনা, অপরাধ ও হামলা-সংঘর্ষ