নোয়াখালী উপকুলে ৩০ জনের মৃত্যু : ৫ হাজার পরিবার গৃহহারা

রুদ্র্র মাসুদ, চরাঞ্চল থেকে ফিরে- ঘূণিঝড় আইলার প্রভাবে নোয়াখালী উপকূল এখন এক স্তব্দ জনপদে পরিণত হয়েছে। চারদিকে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন। মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার উপকূলীয় চরাঞ্চলে কমপক্ষে ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যাদের বেশিরভাগই শিশু। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে শতাধিক। জোয়ারের তোড়ে ঘর ভেসে এবং বিধ্বস্থ হয়ে গৃহহারা হয়েছে অন্তত ৫ হাজার পরিবার। ভেসে গেছে সহস্রাধিক গরু-ছাগল। সরকারি হিসাবে এরিপোর্ট লিখা পর্যন্ত (মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০ টা) ২৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও এ সংখ্যা আরো বাড়ার আশংকা করছে হাতিয়া উপজেলা প্রশাসন। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের কোন কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি বয়ারচরেও। সবচেয়ে তিগ্রস্থ কেরিংচর, চরবাশার এবং নিঝুম দ্বীপে যায়নি কোন সরকারি কর্মকর্তা। বিকাল সাড়ে ৩টায় চরে যান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দিপক চক্রবতী। এর আগে পুলিশ প্রশাসন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাক বয়ারচর যান।এনিয়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ১০ টন চাউল আর নগদ ২০ হাজার টাকা।

মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে শুধু ধ্বংসের চিত্র। জোয়ারের পানি নামার সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধ্বংসের চিত্র। ৫/৬ ফুট পানি ভেঙ্গে একটু খাবার পানি সংগ্রহ করতে লাইন দেখা গেছে মানুষজনের। মাথা গোঁজার ঠাই জোয়ারের পানিতে ভেসে যাওয়ায় শূন্য ভিটায় অবস্থান করছে অনেকে। এছাড়া যাদের স্বজনদের মৃতদেহও মিলেনি তাদের আর্তনাদে আকাশ ভারি হয়ে উঠে। এদিকে সকাল ৮টা থেকে ঘূণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মানুষজন বাড়ি ঘরে ফিরতে শুরু করলেও দুপুরে পুনারায় জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় চরাঞ্চল। ফলে নতুন করে শুরু হয় তিগ্রস্থ মানুষের দূর্ভোগ।

পল্লী চিকিত্ক নোবেল চক্রবর্তী, ব্যবসায়ী শাহরাজ, উন্নয়নকর্মী আলাউদ্দিনসহ স্থানীয় লোকজন এবং তিগ্রস্থ এলাকা ঘুরে এসে অক্সফামের দূর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচীর সমন্বয়ক ইয়াহিয়া বাঙালী জানায়, জোয়ারের পানিতে ডুবে এবং ঘর চাপা পড়ে কেরিং চর, নলের চর, নঙ্গলিয়া এবং চরবাশারে সাথী (৬), সাজনা বেগম (৫), রাশেদ (১৭), রুমী দাস (৫), আব্দুল মালেক ওরফে কাসেম (৪০), আবুল কাসেম ব্যাপারী (৪৫), কাঞ্চন (৮), রোজিনা (৩৫), আজিফা খাতুন (৬০), শাহ আলম (১৩), তানজিনা আক্তার (৩), আলআমিন (১২) ও এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ তিনটি চরে ২ শতাধিক ঘর বাড়ি জোয়ারের তোড়ে ভেসে গেছে। নিখোঁজ রয়েছে ৬০/৭০ জন। স্থানীয় লোকজন জানান, ঘরচাপা পড়ে বয়ারচরের নবীপুর রাজীব (১৫), গাবতলীতে মারুফ (৭) এবং চরলক্ষ্মীতে আম্বিয়া খাতুন (৫৫) এবং সোমবার রাতে বয়ারচরের চেয়ারম্যান ঘাট বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে মালেকা খাতুন (৬০) নামের এক বৃদ্ধা মারা যায়।

এদিকে নোয়াখালীর সর্বদক্ষিণের জনপদ নিঝুম দ্বীপে ক্ষয়ক্ষতির পরিমানও বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় লেকজন। হাতিয়া থেকে সরেজমিনে গিয়ে সাংবাদিকরা নিঝুম দ্বীপে গেলে ÿতিগ্রস্থ মানুষজন, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা জানায় পানিতে ডুবে এখানে রাহেলা বেগম (২৬), সাব্বির (১২), হাফেজ মাঝি (৬০), আয়েশা (১০) সজীব (৫), কবির (৮), করিম (৫), তাহমিনা (৫), আবুল হাসেম (৭), জহির উদ্দিন (১০), হেদায়েত উল্যা (১২), এবং নাজমা বেগম (১০) মারা যায়। এছাড়া হাতিয়ার সুখচরে পলি বেগম (৫) নামের এক শিশু মারা গেছে পানিতে ডুবে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে জোয়ারের পানিতে ৫ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হওয়ায় এসকল পরিবার সম্পূর্ণগৃহহারা হয়ে পড়েছে। ১২’শ গরু-ছাগল ও হরিণ ভেসে গেছে জোয়ারের তোড়ে।

এনিয়ে জানতে চাওয়া হলে এরিপোর্ট লিখা পর্যন্ত (রাত সাড়ে ১০) হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাসেম ১৫জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া ৪ হাজার ৩৭২টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ এবং ৭ হাজার ৪৭০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ’ হয়েছে বলে তিনি জানান।

বিশেষ প্রতিবেদন