রুদ্র মাসুদ, নোয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে ফিরে- মনোয়ারা খাতুন (৩৫) বিলাপ করে কাঁদছেন তাঁর ১০ বছরের মেয়ে রোখসানার জন্য। সোমবার ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে তার মেয়ে ভেসে গেছে। তিন পেরিয়ে গেলেও মেয়ের কোন হদিস পাননি তিনি। জানালেন কেরিং চরের মজিব বাজারের দণি-পূর্ব অংশের লেসকি এলাকায় জোয়ারের তোড়ে ঘর এবং আসবাবপত্রের সাথে তাঁর মেয়েও ভেসে গেছে চোখের সামনে। এই চরে বসতি থাকলেও কোন বেড়ি বাঁধ না থাকায় তার মতো অনেকের সন্তানকে ভেসে যেতে দেখেছে চোখের সামনে।
নোয়াখালীর মূল ভুখন্ড সংলগ্ন সর্বদক্ষিণের হাতিয়া উপজেলাধীন কেরিংচর। ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভানে এ চরে সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্থ হয়েছে। এচরের ৮টি গ্রামে প্রায় ৫ হাজার পরিবারের বসবাস। এখানকার ৪০ভাগ বাড়ি জোয়ারের তোড়ে বিধ্বস্থ কিংবা ভেসে গেছে। মারাগেছে ১১জন। নিখোঁজ রয়েছে এখনো অর্ধশতাধিক। যাদের বেশিরভাগই শিশু। নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারিতে গোটা চরের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। ঝড়ের তিন দিন পরও বৃহস্পতিবার বিকাল তাদের দেখতে যায়নি জেলা কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা, যায়নি রেডক্রিসেন্টও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের পানি এখনো নামেনি। জোয়ারে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে এখানকার গোটা এলাকা জলমগ্ন। পুকুরগুলো লোনা পানিতে এখনো তলিয়ে আছে। এক কলসি খাবার পানি সংগ্রহ করতে চরের ভূমিহীন মানুষকে ৩/৪ফুট পানি ভেঙ্গে টিউবওয়েলের সামনে লাইন দিয়ে অপো করতে হয়। চরের পানিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গবাদি পশুর মৃতদেহ। এতে করে পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। কেরিংচরের বাতানখালী বাজার থেকে পানি ভেঙ্গে মজিববাজার যেতে দেখা যায়, জোয়ারের তোড়ে ঘর ভেসে যাওয়ায় অনেক ভিটি শূন্য পড়ে আছে। কেউ কেউ আসবাবপত্র নিয়ে শূণ্য ভিটায় দাঁড়িয়ে আছে। জোয়ারের ভাসিয়ে নিয়ে আসা পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে অন্যের বাড়িতে।
শূণ্যভিটায় দাঁড়িয়ে ভূমিহীন জসিম উদ্দিন বলেন, কেন্নে ঘর বানাইয়ুম জানি না। আঙ্গোরে বাঁচাইতো অইলে আগে বেড়ি আর কিল্লা বানাইতো অইবো। নইলে সামনে আরো বেশি মানুষ মরইবো। জোয়ারের তোড়ে ঘরের ছালে করে ভেসে আসার অরুণা বালা দাসকে দেখা যায় মেয়েকে নিয়ে ঘরের ছাল মেরামত করতে। এখন কোথায় থাকেন জিজ্ঞাস করতেই ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠেন। বলেন অন্যের দয়ায় রয়েছি জানিনা কবে নিজের ভিটায় উঠতে পারবো। কোমর সমান পানি ভেঙ্গে একটু ত্রাণের আশায় ছুটে আসেন অশীতিপর বৃদ্ধা আনোয়ারা খাতুন (৬৫)। জানালেন ঘরের ছাউনি পর্যন্ত পানি উঠে যাবার পর মেয়ে এবং মেয়ের জামাই মাথায় করে তাঁকে উঁচু জমিতে নিয়ে তোলে। এ যাত্রায় বেঁচে গেছেন তিনি। তবে জীবনে এতো পানি দেখেননি কখনো। পথে পথে এভাবে তিগ্রস্থ ভূমিহীন পরিবারগুলোর আহাজারী গোটা চরের বাতাস ভারি করে তুলেছে। মুজিব বাজার পৌঁছে দেখা যায়, দুই শতাধিক নারী পুরুষের জটলা। সবাই এসেছে ত্রাণের আশায়। কিন্তু তিনদিন পেরিয়ে গেলেও এই চরাঞ্চলে সরকারি সাহায্যের ছিটোফোঁটাও আসেনি। ুব্ধ বৃদ্ধা স্বরধনী দাস (৮৫) বলেন, আমরাতো ভোটার হয়েছি। জাতীয় পরিচয়পত্রেও নাম উঠেছে। তাহলে সরকারের এতো উপো কেনো। একই কথা শোনাগেলো মেহরাজ, আলাউদ্দিন ও সামছুদ্দিনের কন্ঠেও। এমনকি যারা দূর্যোগ নিয়ে কাজ করেন সেই রেডক্রিসেন্টের কোন কর্মকর্তাকেও দেখেনি কেউ।
সবার দাবি শুধুমাত্র ত্রাণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। এখানকার ২০ হাজার মানুষকে রা করতে হলে অভিলম্বে এই চরে বেঁড়ি বাঁধ, কিল্লা এবং ঘূণিঝড়র আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া চরের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দূর্যোগ মুহুর্তে দ্রুত যাতে মানুষজকে উদ্ধার করা যায় সেজন্য পর্যাপ্ত নৌ-যান প্রস্তুত রাখতে হবে। এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাতিয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাসেম খান বলেন, দূর্যোগ থেকে চরের মানুষকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণ করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।






