কোম্পানীগঞ্জে মা ও ধর্ষণের স্বীকার মেয়েকে দোররা মেরে রক্তাক্ত করল সমাজপতিরা : গ্রেফতার-৫

চ. নো. রিপোর্ট- নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তকে রেহাই দিয়ে ধর্ষণের স্বীকার স্বামী পরিত্যাক্তা এক মহিলা (৩০) ও তাঁর মাকে (৫০) দোররা মেরে রক্তাক্ত করেছে সমাজপতিরা। তন্মধ্যে ধর্ষিতাকে ১০১ ও তার মাকে ১০ দোররা দেয়া হয় । উপজেলার চরহাজারী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বদু খাঁর বাড়িতে গত বুধবার গভীর রাতে এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালে আহত অবস্থায় ধর্ষিতা ও তার মাকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জসহ গোটা জেলায় তোলপাড় শুরু হলে সহকারি পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জাবেদুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে আবুল খায়ের খাঁ (৬৫), চৌধুরী মিয়া (৬৩), তাজুল ইসলাম (৪০), মানিক (৩৫) ও বেচুমিয়া (৩৫) নামে ৫ সমাজপতিকে গ্রেফতার করেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সমাজপতিদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার স্বামী পরিত্যাক্তা মহিলা অভিযোগ করেন, পাশ্ববর্তী চরকাঁকড়া গ্রামের দুলাল (৩৫) ৫/৬ মাস আগে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এতে সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বিষয়টি দুলালকে জানালে সে গর্ভপাত ঘটানোর পরামর্শ দেয়। পরবর্তীতে একই এলাকার মোহছেনা নামের এক মহিলার মাধ্যমে সে বসুরহাটের দি নিউ ইবনে সিনা ডায়গনষ্টিক এন্ড হাসপাতালে নিয়ে আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে গত ৬জুন বৃহস্পতিবার গর্ভপাত ঘটায়। এতে তার প্রচুর রক্তরণ হলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বিষয়টি জানাজানি হয়। এনিয়ে দুলালের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিতে যাওয়ার পথে মাছুয়াদোনা গ্রামের হোসেনের নেতৃত্বে সমাজপতিদের কয়েকজন এলাকায় বিষয়টির বিচারের আশ্বাস দিয়ে তাকে বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য করে। বুধবার রাতে তাঁদের বাড়িতেই অভিযুক্ত দুলালকে অনুপুস্থিত রেখে সমাজ কমিটির সভাপতি আবুল বাশারের সভাপতিত্বে সালিশি বৈঠক বসে। এসময় সমাজের সেক্রেটারী ইমাম হোসেন, সমাজপতি সিরাজ খাঁ, আবুল খায়ের খাঁ, চৌধুরী মিয়া, তাজুল ইসলাম, হারুন, সিরাজ আলম, বেচু মিয়াসহ শতাধিক লোকের উপস্থিতিতে শালিসী বৈঠকে ধর্ষিতা ও তার বৃদ্ধা মাকে একতরফা দোষী সাব্যস্ত করে যথাক্রমে ১০১ ও ৫০ দোররা মারার রায় ঘোষণা করা হয়। পরে বৃদ্ধা মায়ের আকুতিতে তার ৪০ দোররা মাফ ১০ দোররা করা হলেও ধর্ষিতার ১০১ দোররার রায় কার্যকর করা হয়। বৈঠকের সভাপতির নির্দেশে উপস্থিত বেচু মিয়া সালিসের রায় কার্যকর করেন। মহিলার মা (আনোয়ারা বেগম-৫০) জানান, ‘আঁই মাইয়্যার অন্যাইর লাই হেতাগো হাঁর উরপে হইড়ছি। কিন্তু হেতারা আঁর কোন কতা হুনে ন। আঙ্গো মায়ে-ঝিরে হিটতে হিটতে অজ্ঞান কইরচ্ছে। হের হরেও মাইর বন্ধ করে ন। তিনি অভিযোগ করেনÑ দোররা মারার পর সমাজপতিদের কয়েকজন তাঁকে এই ঘটনা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে জানে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার একাধিকবার সালিসের সভাপতি আবুল বাশারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে সালিসী বৈঠকে উপস্থিত সিরাজ খাঁ সালিসী বৈঠকের আয়োজন এবং রায় কার্যকরার কথা স্বীকার করে বলেনÑ ‘এটি সামাজিক সিদ্ধান্ত। তাঁরা অন্যায় করেছে। তাই সামাজিক ভাবে তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে অভিযুক্ত দুলালেরও বিচারের ব্যাবস্থা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন’। এদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নোয়াখালী পুলিশ সুপার খন্দকার লুৎফুল কবিরের নির্দেশে সহকারি পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জাবেদুর রহমান হাসপাতালে গিয়ে ধর্ষিতা ও তার মায়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং এ বিষয়ে কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই সমাজপতিদের ধরতে অভিযানে নামেন। এরিপোর্ট লিখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৭টা) ৫জনকে গ্রেফতার করা হয়। কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাকের হোসাইন ধর্ষিতা ও তার মাকে দোররা মারার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সংশ্লিষ্ট কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। বাকিদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে।

বিশেষ প্রতিবেদন