খার্তুম থেকে কাবুল : সত্যিকার ইসলামের সন্ধান

প্রকৌশলী আমিরুল মোমিন বাবলু-প্রকৌশলী আমিরুল মোমিন বাবলু, যুক্তরাষ্ট্র। 
১৮৮১ সালে পৃথিবীর অদ্বিতীয় ব্রিটিশ নৌশক্তি ফরাসীদের বিতাড়িত করে গোটা মিশর তাদের আয়ত্বে আনে। সূদান তখন মিশরের একটি প্রদেশ। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যে সূদানের ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ আহাম্মদ, যিনি ‘‘মেহেদী” নামে পরিচিত খার্তুম দখল করে নিলেন। ব্রিটিশ জেনারেল গর্ডন বীরত্বের সাথে লড়ে তার সৈনিকদের সাথে মৃত্যুবরণ করেন। মেহেদীর নেতৃত্বে সূদানে প্রতিষ্ঠিত হলো ‘‘ দরবেশে সাম্রাজ্য”। জোনরেল গর্ডনের করুন মৃত্যু এবং সূদান হারানো- ব্রিটিশরা সহজে মেনে নিতে পারেনি। ১৩ বছর পর ১৮৯৮ সালে জেনারেল কিচেনার নেতৃত্বে ওমডারমানের যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনারা মেহেদীর দরবেশ বাহিনীকে পরাজিত করে। মেহেদী যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়ে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিটেনের ভাবী প্রধানমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সমরনায়ক উইনস্ট চার্চিল ওই যুদ্ধের থিয়োটরে ছিলেন এক নতুন আর্মি অফিসার হিসাবে। চার্চিল ওই যুদ্ধের মাঠ থেকে লিখেন তার বিখ্যাত River War বইটি; তাতে তিনি লিখেন- "What the horn is to the rhinoceros, what the sting is to the wasp, the Mohammedan faith was to the Arabs of the Soudan- a faculty of offence and defence." তার মতে রাইনোসেরাসের কাছে তার সিং যেমন, সূদানের আরবদের কাছে মুসলমান ধর্মটাও সেরকম- আক্রমন এবং আত্মরা দুটোরই শক্তি। একসময়ের শক্তিধর মুসলমান সাম্রাজ্যগুলো এক এক করে পশ্চিমাদের কাছে হার মানলো এবং অধীনস্ত হলো। ইসলামিক শরিয়া আইন উঠে গিয়ে চালু হলো পাশ্চাত্য আইন। অথচ এই শরিয়া আইনের মাধ্যমে একসময়ে পৃথিবীর এক প্রান্তের মুসলমান সাম্রাজ্যের সাথে অনেক দূরের (আল্টান্টিক থেকে ভারত মহাসাগর) সাম্রাজ্যের সেতুবন্ধন ছিল। মুসলমান আমীর, সুলতান, খলিফারা একে অন্যের সাথে রাজ্য বিস্তারে যুদ্ধ করলেও আলেমরা (যারা শরিয়া রা করতেন) ছিলেন নোংরা, রাজনৈতিক এবং সামরিক দ্বন্ধের উর্ধ্বে। দশ শতাব্দী থেকে শুরু করে সকল আলেমরা আইনশাস্ত্রে শিা নিতেন মূলত: ৪টি ইসলামিক স্কুলে- সাফী, মালিকী, হানফী এবং হানবলী। এ ৪টির যে কোনো একটি অন্য স্কুলের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। অনেক বছর সেখানে অধ্যয়ন করার পর আইন শাস্ত্রে একজন সনদ পেতেন এবং পরবর্তীতে শরিয়া বিশেষজ্ঞ হতেন। এছিলো গতানুগতিক ইসলামিক জ্যুরিখ হওয়ার একমাত্র নিয়ম।

উপনিবেশ স্থাপনের পর ইসলামিক শিা এবং কতৃত্বে বিরাট বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্বাধীন রাজারা তাদের স্বার্থে বিভিন্ন রকমের শরিয়া আইন চালু করলো। অনেকে গতানুগতিক পদ্ধতিতে শিা না নিয়েই রাতারাতি স্বÑঘোষিত ইসলামিক চিন্তাবিদ বনে গেলো। পরাধীনতার গ্লানী, পশ্চিমাদের নির্যাতন, দেশিয় প্রভুদের দুঃশাসন অনেককে বিদ্রোহী করে তুললো। তারা জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলামিক ব্যানারে আশ্রয় নিলো। জন্ম নিলো ‘‘পলিটিক্যাল ইসলামের”। ইসলামের পুনর্জাগরণের নামে যারা পলিটিক্যাল ইসলামের নেতৃত্বে আসলো তারা কেউ গতানুগতিক ধারার ট্রেনিংপ্রাপ্ত, সনদধারী আলেম নন; বরং পাশ্চাত্য শিার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল’ইয়ার। তারা স্বঘোষিত ইসলামিক চিন্তাবিদ সেজে গেলো। ইসলামের শান্তির বাণী, ভালোবাসা, সম্ম্প্রীতি, সৌহার্দ্ব্যরে প্রতি এদের তেমন বিশ্বাস ছিলো না। তারা ছিলো প্রতিরোধে, আক্রমনে এবং বিদ্রোহে বিশ্বাসী। শুরু হলো ইসলামের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনার লড়াই। একদিকে মডারেট ইসলামিস্ট অপরদিকে রেডিক্যাল পরানিস্ট, ফান্ডামেন্টালিস্ট, এক্সট্রিমিস্ট। ইসলামে আজ যারা প্রতিনিধিত্ব করতে লড়ছেন তারা হলেন ঃ ১- সেক্যুলার ঃ সেক্যুলারিস্টরা অধিক ব্যক্তি স্বাধীনতার প।ে সমাজিক বা রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে ধর্মের অনুপস্থিতি তাদের কাম্য। তাই বলে তাদের সাথে সংস্কার বা প্রগতির সম্পর্ক নেই ! ২- মডারেট এবং ইসলামিস্ট ঃ প্রসিদ্ধ ইসলামিক পন্ডিত ড. খালেদ আবু ফাদেলের মতে- "Islamists, as opposed to the secularists, are those who pursue private or public political, sociological or economical agendas while considering Islam to be their authoritive, but not necessarily exclusive frame of reference." অর্থ্যাৎ ইসলামিস্ট সেক্যুলারিস্ট থেকে ভিন্ন যারা তাদের ব্যক্তিগত অথবা পাবলিক রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইসলামের নিয়ম মেনে চলে। তাই বলে কেবলমাত্র মানদন্ড হিসাবে নয়। মডারেটরা কোরআন, হাদীসের নিয়মকানুন সঠিকভাবে মেনে না চললেও ইসলামিক রীতিনীতির প্রতি বিশ্বাসী, শ্রদ্ধাশীল এবং ওই চিন্তায় অনুপ্রাণিত। ৩- পুরিটান (গোড়া) বা রেডিক্যাল ঃ ড. খালেদ আবু ফাদেলের মতে " Puritan is not represented by formal institutions; it is a theoritical orientation, not a structured school of thought. Therefore one finds a broad range of ideological variations and tedencies within it. But the consistent characteristic of puritanism is a supremacist ideology that compensates for feeling of defeatism, dispowerment, and alienation.” তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ধর্মীয় গোড়া বা পুরিটানরা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি নয়। এদের বহু প্রকারভেদ আছে। কিন্তু এরা সবাই- নিজেদেরকে সবার চেয়ে বড় মনে করে। সম্ভবতঃ পরাজয়ের গ্লানী, মতাহীনতা এবং নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য। ডঃ ফাদেলের মতে পুরিটান বা ইসলামিক রেডিক্যালদের উৎপত্তি সউদী হুবাবী মতবাদ থেকে। আলকায়দা এবং তালেবানরা ওহাবী মতবাদ থেকে অনুপ্রাণিত। ওহাবী আন্দোলন সউদীআরবে উনিশ শতাব্দীতে শুরু করেন মোহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব। তিনি মাদ্রাসা ড্রপআউট স্বঘোষিত ইসলামিক চিন্তাবিদ ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিলো কেবল আরবরাই পারে একটি সত্য, নির্ভুল ইসলামের নেতৃত্ব দিতে। তিনি বেদুইন সংস্কৃতিকে ইসলামের রীতিনীতি মনে করে একটি ভ্রান্ত মনের পরিচয় দেন। মূলতঃ আরব জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে আব্দুল ওহাব হাত মেলান আল-সউদ (আধুনিক সউদী রাজতন্ত্রের জন্মদাতা) এবং ব্রিটিশ শক্তির সাথে অটোমন তুর্কি খেলাফতকে আরব ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করার জন্যে। হানাফি জুরিস্ট ইবনে আবিদিন (১৮৩৭) এবং মালিকী জুরিস্ট আল-সই (১৮২৫) আব্দুল ওহাবকে আধুনিক ইসলামের খারেজী বলে উল্লেখ করেন। এখানে উল্লেখিত যে, খারেজীরাই একদিন হযরত আলী (রাঃ) কে হত্যা করে। পরবর্তীতে যে সকল রেডিক্যাল ইসলামিক চিন্তাবিদের আগমন ঘটে, যেমন আবু আল-আলা মওদুদী এবং মিশরের সৈয়দ কুতুব। তাদের সবার চিন্তাধারা এবং লেখনীর সাথে আব্দুল ওহাবের অভিনব মিল খুজে পাওয়া যায়। মওদুদী কেবল একটি জায়গায় আব্দুল ওহাবের সাথে দ্বিমত ছিলেন। সেটি হলো- delayed jthed -অর্থাৎ যতণ পর্যন্ত নিজের সামরিক শক্তি শত্র“র সমক না হবে ততণ সংঘাতে যাওয়া উচিত হবে না। আর মিশরের ইসলামিক ব্রাদার হুডের সৈয়দ কুতুবকে বলা হয় সকল জঙ্গীবাদের পিতা। সর্বোপরি মডারেট ইসলাম এবং রেডিক্যাল ইসলামের অমিল দেখা যায় দু’য়ের মধ্যে খোদা এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ধরণের মতবিরোধে। রেডিক্যালের মতে--"God is to be feared and obeyed", আল্লাহকে ভয় পেতে হবে এবং মেনে চলতে হবে। অপরদিকে মডারেটদের মতে " Love God for God's kindness, generosity, mercifulness, compassion, and beauty...To love God, a person must love all that God loves and dislike all that God dislikes." (ড. ফাদেল) অর্থাৎ আল্লাহকে ভালোবাসা তার দয়া, উদারতা, কৃপা, সহানুভূতি এবং সৌন্দর্য্যরে জন্যে। কোনো ব্যক্তী আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে আল্লাহ যে সকল কিছু ভালোবাসেন তাকে ভালোবাসতে হবে এবং যেগুলো অপছন্দ করেন সেগুলোকে ঘৃণা করতে হবে।