তারা এখনো থেমে নেই...
-রুদ্র মাসুদ-
হঠাৎ করেই বিজয় দিবসে চলমান নোয়াখালীর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়। যথারীতি pic-2তড়িগড়ি করে লেখা আহবান, বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজ করতে হয়েছে। এর আগে সাপ্তাহিক ধুমকেতুর বিজয় দিবস সংখ্যার জন্য লেখা চেয়েছিলেন পত্রিকাটি নতুন আঙ্গিকে প্রকাশের দায়িত্ব কাঁধে নেয়া দুই অনুজ অমৃত লাল ভৌমিক সুমন আর সুমন সওদাগর। তাদেরকে দেয়া কথা রাখতে পারিনি। এর কারণ দুটি, একটি হচ্ছে চলমান নোয়াখালীর আয়োজন, অন্যটি হচ্ছে বিষয় নির্বাচন নিয়ে। এবারের বিজয় দিবসের লেখা লিখতে গিয়ে বারবার জট পাকিয়ে ফেলেছি নিজের মধ্যেই। কিছুটা ক্ষোভও এর জন্য দায়ী। কারণ গত কয়েক বছরে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট দিবসগুলো নিয়ে যত কান্ড ঘটেছে তা রীতিমতো বেদনাদায়ক।
এবছরের বিজয় দিবসের আগের দিন অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর জেলা শহর মাইজদীতে বিজয় র‌্যালী করেছে ছাত্র শিবির। র‌্যালীতে অংশগ্রহণকারীদের বয়স কারোরই ৩০’র বেশি নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। বিজয় দিবসের র‌্যালী করতে তাদের নামানো হয়েছে, কিন্তু শ্লোগানে যথেষ্ট উত্তেজিত তারা। যে র‌্যালীটি হবার কথা ছিলো উৎসবমুখর, অথচ র‌্যালীতে অংশ নেয়া তরুণদের কন্ঠে আক্রমনাত্ম শ্লোগান। হঠাৎ মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, তারা কী জানে ? ৭১’র এ তাদের সংগঠনটি (তখনকার ছাত্র সংঘ) ও মুরুব্বী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ? যে বিজয়ের পথ রুদ্ধ করতে তাদের সংগঠন দেশব্যাপী হত্যা, নির্যাতন, লুটতরাজ আর ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য কর্মে নিয়োজিত ছিলো।
মনের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে গেলাম মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারানো তৈয়বা খাতুনের করুণ অবস্থার সংবাদটি সংগ্রহ করতে। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর এমন করুণ চিত্র দেকে নিজের প্রতিই ঘৃণা জন্মে। অশ্র“ সংবরণ করতে থুথু ফেলার ভান করে পায়চারী করে নিজেকে সামলে নিলাম এ যাত্রায়। চৌমুহনীতে ফিরেই দেখতে পাই বিজয় দিবসে জামায়াতে ইসলামীর আলোচনা সভার জোরালো মাইকিং। একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রচার করা হচ্ছে প্রধান অতিথি হিসাবে। কিছুণ আগের স্তিমিত ক্ষোভই আবার জ্বলে ওঠে। একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং জীবনবাজীরাখা ৭১’র রণাঙ্গণের শত্র“পরে কতো আপন (!) এইভেবে। ইসলামী অর্থনীতির বেড়াজালে আটকে আর আমাদের দেশের মতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতাদের হাত ধরে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করছে তা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়। অথচ স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরও এরা নীতি, আদর্শ, মেধা-মনন কোনটিতেই মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করে না।
১/১১’র পরবর্তী সময়ে তাদের আস্ফালন দেখেছি। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিষ্টিটিউট মিলনায়তনে সহযোগী সংগঠন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ ডেকে প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধার পিঠে লাথি মেরে লাঞ্চিত করেছে জামাতের কর্মী বাহিনী। ৭১ এ এদের খুন-ধর্ষণের বিচার যেমনি আজও এদেশে হয়নি তেমনি এখনো তারা যে হারে মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্চিত করছে তাদের বিচার হচ্ছে না। যারফলে দিন দিন এদের আস্ফালন বেড়েই চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে আঘাত করতে এরা এখনো তৎপর। রাজধানী থেকে শুরু করে দূর্গম চরেও চলছে এদের নীলনক্সা বাস্তবায়নের কাজ।
কখনো বিএনপির সাথে জোট গড়ে কখনো আওয়ামীলীগের সাথে কৌশলগত ঐক্য গড়ে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছে। এটা প্রকাশ্য হলেও তাদের আসল উদ্দেশ্য আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা। যার নমুনা দেখলাম মঙ্গলবারের র‌্যালী এবং আলোচনা সভার মাইকিংয়ে। দেখেছি বিগত জোট সরকারের সময়ে, দেখছি এখনো। ঢাকায় যেমন স্বাধীনতা বিরোধী চক্র সক্রিয় তেমনি সক্রিয় নোয়াখালীতেও। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, শিকতা, সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে সর্বত্রই স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার চক্র ৭১’র প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। বিগত বিএনপি-জামাত জোটের সময় একজনকে দেখেছি কিভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশের নামে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপরে রাজনৈতিক কিভাবে ঘায়েল করছেন। শুধু তাইনয় মুক্তিযুদ্ধকালীণ সময়ে যারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসর হিসাবে কাজ করেছেন এমন ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা এই মহাজোট সরকারের সময়েও সক্রিয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও তাদের নানা আয়োজন। এসবই লোক দেখানো শুধু সময় পার করা ছাড়া কিছুই নয়।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বখতিয়ার ভাই’র (একুশে টিভির তখনকার নোয়াখালী প্রতিনিধি বখতিয়ার শিকদার) সাথে চরবাটা গিয়েছিলাম একজন রাজাকারের সাক্ষাৎকার নিতে। সুবর্নচর উপজেলার একটি মাদ্রাসার সহকারী শিক এবং বর্তমানে জামাত রাজনীতির সাথে যুক্ত সেই ব্যক্তির নাম মৌলভী আবুল কাসেম।  স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে নোয়াখালী কারামাতিয়া আলীয় মাদ্রাসার তখনকার ছাত্র ছিলেন তিনি। পিটিআইতে পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে তখনকার জামাতের ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী আবুল কাসেমসহ  ছাত্রসংঘের ৫০/৬০ কর্মী রাজাকার হিসেবে সশস্ত্র প্রশিণ গ্রহণ করেন । তাদের সবার দলনেতা ছিলেন কোম্পানীগঞ্জের মাওলানা আবুল হোসেন। প্রশিণ শেষে তাদেরকে মাইজদী কোর্ট রেল ষ্টেশনের রাজাকার ক্যাম্পে মোতায়েন করে পাকিস্তানী আর্মি। সেখানে ২৫জনের রাজাকার দলের সাথে নিয়মিত অবস্থান করতেন তিনিও।
যুদ্ধকালীন সময়ে দুইবার পাকিস্থানী আর্মির সাথে অপারেশনে গিয়েছিলেন। একবার রাইফেল নিয়ে বেগমগঞ্জের বগাদিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে পাক সেনাদের সাথে আক্রমন করেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মুহুর্মুহু আক্রমনে পাক সেনাদের পেছনে থাকা রাজাকাররা অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে ট্রাকে করে পুনরায় মাইজদীতে ফিরে আসে। আরেকবার সদর উপজেলার বিনোদপুরে মুক্তিযোদ্ধারা লুকিয়ে আছে খবর পেয়ে পাক সেনাদের সাথে বিনোদপুর গ্রামে অভিযানে অংশ নেন।
সাত ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত দিবসের দিন মুক্তিযোদ্ধরা মাইজদী কোর্ট ষ্টেশন আক্রমন করলে অন্যদের সাথে তিনিও অস্ত্রসহ আত্মসমর্পন করেন। তাদের সাথে থাকা ২৫/৩০জন রাজাকারকে নিয়ে যাওয়া হয় আব্দুল্যা মিয়ার হাটে। সেখানে ১০/১২দিন আটক রাখা হলেও শুধু মাত্র একদিন তাদেরকে মারধর করা হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয়ের পর নোয়াখালী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক দানবীর হাজী ইদ্রিস (একরামুল করিম চৌধুরী এমপির পিতা) রাজাকারদের কাছ থেকে পরবর্তীতে বিচারের জন্য ডাকা হলে যেনো হাজির হয় এই মর্মে লিখিত মুচলেখা নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেন।
আবুল কাসেমের এই কাহিনী ঢাকার একটি দৈনিকে গুরুত্বের সাথে ছাপা হবার পর বেকায়দায় পড়েন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর প থেকে তাঁর প্রতি চাপ আসে সাংবাদিকদের সাথে মুক্তিযুদ্ধকালীণ সময়ের বিষয় নিয়ে কথা বলার কারণে।
এ লিখাটি যখন কম্পিউটারের বোতাম টিপে কালো হরফে কম্পোজ করছিলাম তখন বারবার মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীণ সময়ে কোন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা তাদের সহযোগীতা করেছে এমন মানুষদের এভাবে কী ছেড়ে দিয়েছে ছাত্র সংঘের কর্মীরা ? না দেয়নি। সেদিন পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের মধ্যদিয়ে বাঙালীর বিজয়ে তারা কিছু সময়ের জন্য বিরতি দিলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামীলীগ বিরোধী রাজনৈতিক স্রোতে তারা গা ভাসিয়ে দেয়। যা পুরোপুরি উন্মুক্ত হয় স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবতী রাজনৈতিক ময়দানে। সে থেকে আজ অবদি তারা শক্তি সঞ্চয় করে বারবার আঘাত করেছে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গায়ে। তারা থেমে নেই- থেমে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ শক্তিগুলো। নিজস্ব অবস্থান থেকে স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠি, ব্যক্তি ও সংগঠনের ক্রীয়া কলাপকে থামিয়ে দেয়ার সময় এসেছে। সেটি রাজধানীতে যেমন নোয়াখালীতেও তেমন। না হয় তারা মঙ্গলবারের র‌্যালীতে অংশগ্রহণকারীদের মতো আমাদের আগামি প্রজন্মকেও উত্তেজিত করবে, আক্রমনাত্মক করে তুলবে। ইসলামী অর্থনীতির বেড়াজালে আটকে মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন কব্জায় নিতে মরিয়া তেমনি বিজয় উৎসবে সামিল হতে দিবে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ প্রজন্মকেও।