নোয়াখালী চরাঞ্চলে কৃষি উন্নয়নের সম্ভাবনা, অন্তরায়
11-অধ্যাপক  ড. সঞ্জয় কুমার অধিকারী-
বাংলাদেশের ১৬টি উপকূলীয় জেলার মধ্যে নোয়াখালী একটি। একসময় এ জেলার বিশাল জনপদ সমুদ্র/নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কালের স্রোতে সেসব এলাকায় আবার পলি জমে বিশাল চর জেগে ওঠে।  সেখানে আবার নতুন করে জনপদ গড়ে উঠেছে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই চরাঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদ এ তিন ক্ষেত্রের সম্ভাবনাই উজ্জ্বল। নোয়াখালীর মোট আবাদযোগ্য  জমির পরিমাণ ১ লক্ষ ৯৮ হাজার হেক্টর। এর মূল ভূমির অধিকাংশ জমিই একফসলী। গড়ে নোয়াখালীর শস্য নিবিড়তা ১৮০ যা মোটেই সন্তোষজনক নয়। এখানকার শস্য  নিবিড়তা ২৫০ এর অধিক করা সম্ভব। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করতে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। চরাঞ্চলে রবি মৌসুমে অনেক জমি অনাবাদী থাকে, এ ফসলি জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। সম্ভাবনাময় ফসলসমূহের মধ্যে বোরো ধান, সয়াবিন, চিনাবাদাম, সবজি, তরমুজ এবং ডাল জাতীয় ফসল লাভজনকভাবে আবাদ করা যায় যা দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ এলাকায় কৃষকরা বিপুল পরিমানে সয়াবিন ও বাদাম চাষ করে। মজার বিষয় হলো এ দুটি ফসলের বীজ কৃষকরা নিজেরাই সংগ্রহ করে এবং সংরক্ষণ করে থাকে। তাছাড়া অভিজ্ঞতায় দেখা যায় (গবেষনালব্ধ ফল হয়) এ এলাকায় উৎপাদিত বীজের মানও ভাল। দেশে সুস্থ ও মানসম্পন্ন বীজের বড় অভাব। এ দিকটায় নজর দিলে বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নোয়াখালী জেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং কৃষকের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে।  নোয়াখালী অঞ্চলে কৃষি ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা রয়েছে তা কয়েকটি প্রধান সমস্যার কারণে বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
জলাবদ্ধতা ঃ সবচেয়ে বড় সমস্যা, খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের Pic-3খামার তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। জলাবদ্ধতার জন্য ইচ্ছে থাকা সত্বেও কৃষকরা আউশ ও আমন কোনো মৌসুমেই উফশী ধানের চাষ করতে পারেনা। জেলার ১,৯৮,০০০ হেক্টর আবাদী জমির ১,৫৮,০০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়। এর মধ্যে উফশী ধান চাষ হয় মাত্র ৪০,০০০ হেক্টর জমিতে। শুধুমাত্র উফশী ফসল চাষ করে ধানের ফলন দ্বিগুন বাড়ানো সম্ভব। দেশি জাতের রোপা আমন ধানের জীবনকাল উফশী থেকে অনেক বেশি হওয়ায় দেরীতে পাকে ফলে রবি ফসলের মৌসুম থাকেনা, সঙ্গত কারণেই রবি মৌসুমের সময় জমি অনাবাদী থাকে। অন্যদিকে আউশ মৌসুমে স্থানীয় জাতের আউশ ধান চাষ করায় উফশী রোপা আমন ধান চাষের সময় পেরিয়ে যায়।
লবনাক্ততা ঃ এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যহত হওয়ায় অন্যতম কারণ লবনাক্ততা। সমুদ্র বিধৌত চরাঞ্চল হওয়ার কারণে সহজাত কারণেই মাটির লবনাক্ততা বেশী । মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত এই লবনাক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। জুন-জুলাইতে বৃষ্টি হওয়ার পর লবনাক্ততা আস্তে আস্তে  কমতে থাকে।
এখানে জলাবদ্ধতার সমস্যা না থাকলে উফশী ধানের চাষ করা সম্ভব হতো, ফলে আগাম রবিশস্য চাষ করা যেত। আশার কথা প্রাকৃতিক কারণেই দিন দিন লবনাক্ততা কমছে । লবনাক্ততা যেহেতু বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বেশি থাকে তাই ঐ সময়টা এড়িয়ে কিভাবে ফসল ফলানো যায় সে প্রচেষ্টাও চলছে।
এ অঞ্চলের মাটির পানি ধারণ মতা কম হওয়ায় মার্চ থেকে মে পর্যন্ত লবনাক্ততা বেশি থাকে। জৈব সার/সবুজ সার প্রয়োগ করে মাটির পানি ধারন ক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কৃষকদের এ ব্যাপারে সচেতন করার জন্য সরকারি, বেসরকারি সংগঠন কাজ করছে। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসের পূর্বে খাল ও নদীতে মিঠা পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারলে শুষ্ক মৌসুমে যখন লবনাক্ততা বেশি তখন মিঠা পানির সেচ দিয়ে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
কৃষকের সচেতনতা ঃ কৃষকদের অধিকাংশই প্রান্তিক। দারিদ্রতার কারণেই  শিক্ষার প্রসার ঘটছেনা। ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছেনা। নানা ধরনের প্রকল্প এখানে বাস্তবায়িত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু  টেকসই  হচ্ছেনা। প্রকল্পকাল শেষ
হলেই কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ছে ফলে কাঙ্খিত লক্ষে পৌছানো সম্ভব হচ্ছেনা। সেজন্য শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত জরুরী। কৃষকদের নিজের উন্নয়ন নিজেদেরই করতে হবে এই সচেতনতা না আসা পর্যন্ত কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব হবেনা।
সমন্বিত উদ্দ্যোগ ঃ শুধুমাত্র কৃষিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েই উন্নয়নের অন্যান্য অঙ্গকে এর সাথে যুক্ত করে সমম্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।
কিছু সুপারিশ ঃ
১. কৃষক পর্যায়ে সকল ফসলের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরণ নিশ্চিত করা। এ লক্ষে
ক. বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন একটি বীজ উৎপাদন খামার তৈরি করতে পারে। ঐ খামারের তত্বাবধানে চুক্তিবদ্ধ কৃষকের মাধ্যমে অধিক বীজ সংগ্রহ করা সম্ভব।
খ. ভাল বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া দরকার।
গ. নিজ বাড়িতে বীজ সংরণের কলাকৌশল সম্পর্কে কৃষকদের জ্ঞাত করানো।
২. জলাবদ্ধতার কারণগুলো চিহ্নিত করে সত্বর তা নিরসনের উদ্দ্যোগ গ্রহণ করা । এ সমস্যার সমাধান  না হলে অন্য যেকোনো উদ্দ্যোগ গ্রহণ নিরর্থক হয়ে পড়বে।
৩. অধিক উৎপাদনশীল লবনাক্ততা সহনীয় জাত, লবনাক্ততা এড়িয়ে যেতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনে সচেষ্ট  হওয়া।
৪. উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা এবং কৃষকরা যাতে ফসলের ন্যায্যমূল্য পেতে পারে সে ব্যবস্থা  করা।
৫. কৃষকদের আত্মউন্নয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রনের বিষয়ে সচেতন করতে উদ্দ্যোগ গ্রহণ করা।
৬. কৃষি, মৎস্য, পশু সম্পদ, স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কৃষির সাথে প্রত্য ও  পরোভাবে জড়িত সকলকে নিয়ে সমন্বিত উদ্দ্যোগ গ্রহণ করা।
লেখক- কৃষিবিদ
উপাচার্য,
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।