-ড. এম আমিন-খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উন্নত কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত প্রতিকূল কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে রায়েছে অনেক জমি যেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়া দরকার। এরূপ
প্রতিক‚ল অঞ্চলের মধ্যে উপকূলীয় চরাঞ্চল- যা দেশের ১৯টি জেলার ১৪৭টি উপজেলার প্রায় ২.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে বিস্তৃত। এর মধ্যে ১১টি জেলার ৪৮টি উপজেলায় সাইক্লোন, লবণাক্ততা এবং জোয়ার ভাটার ঝুঁকি রয়েছে। উক্ত জমির প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর লবনাক্ত। যা বাংলাদেশের মোট চাষযোগ্য জমির ৩০% এর অধিক। শুধুমাত্র সুন্দরবনের ৪ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ব্যাতীত সম্পূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলই কৃষি কাজের অন্তর্ভুক্ত। এ সকল অঞ্চলে কৃষি জমির ব্যবহার অত্যন্ত কম যা খসড়া হিসাব মতে দেশের গড় কৃষি জমির ব্যবহারের ৫০% (পিটারসেন এবং শিরিন, ২০০১)। তাই এই অঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রা উন্নয়নে সর্বাগ্রে দরকার কৃষি ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে আলোচ্য প্রতিবেদনে উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির অন্তরায় এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও নোয়াখালীর চিত্র-
আমাদের বিবেচনার বিষয় হচ্ছে নোয়াখালী জেলার বর্তমান জরবায়ুগত অবস্থান এবং পূর্বের অবস্থান
তুলনায় এর পরিবর্তনের মাত্রা। বৈশ্বিক উষ্ণায়নেরসাথে সাথে যুগপথভাবে পরিবর্তিত হতে চলেছে উপক‚লীয় জেলা নোয়াখালীর জলবায়ু। চিত্র-১ এবং চিত্র-২ হতে (চিত্র ১,২,৩,৪ দেখুন ১০ এর পাতায়) এ বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, এই অঞ্চলে ও মাসিক গড় সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পরিবর্তন ও আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। মার্চ-এপ্রিল মাসের (গ্রীস্মকাল) দিকে দেখা যায় যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১.১ থেকে ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে বিগত প্রায় ২৫ বছর পূর্বের তুলনায়। মাসিক গড় সর্বনিন্ম তাপমাত্রা বিগত ২৫ অথবা ১০ বছর পূর্বের সাথে গ্রীস্মকালে প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও শীতকালীণ সর্বনিন্ম তাপমাত্রা বিগত ২৫ বছর পূর্বের তুলনায় ০.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে যা আমাদের এই অঞ্চলের মাটি, পানি, বায়ু মন্ডল, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, গাছপালা ইত্যাদির ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। চিত্র ৩ থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বিগত প্রায় ২৫ বছর পূর্বের তুলনায় বর্তমানে বৃষ্টিপাতের পরিমান এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে (প্রায় ১৯% কমে গেছে)। তবে এই
অঞ্চলে বর্ষাকালীণ বৃষ্টির পরিমান বাড়লেও শীতকালীণ হালকা বৃষ্টিপাতের পরিমান কমে গেছে ব্যাপক হারে, যা এই অঞ্চলের কৃষি ও জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে বলে ধারণা করা যায়। চিত্র-৪ এর তুলনামূলক আলোচনার সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বিগত প্রায় ১৫ বছর যাবত ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে বৃষ্টিপাতের পরিমান, যার কারণে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এই অঞ্চলের মৃত্তিকার লবণাক্ততা। শীতকালীণ উষ্ণায়ন ও বৃষ্টিপাত কমে যাবার কারণে এই অঞ্চলের কৃষি, মৃত্তিকা ও সুপেয় মিষ্টি পানির অভাব দেখা দেবে যা এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমান প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।টেবিল-৩ হতে এটা অনুধাবনযোগ্য যে, বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার (নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষীপুর) লবণাক্ততার পরিবর্তনের মাত্রা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের। বিগত প্রায় ৩ দশক যাবত লক্ষীপুর ও ফেনী জেলার লবণাক্ততার মাত্রা (০৮.৯% ও ১৮.৮) কমলেও নোয়াখালীর উপক‚লীয় অঞ্চলে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮% হারে এবং মোট আরো ৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমি লবণাক্ত হয়ে গেছে যা ভবিষ্যতের জন্য দুর্ভাবনার কারণ হতে পারে।
লবণাক্ততার পাশাপাশি উপকূলীয় চরাঞ্চলে ফসল উৎপাদনে যেসব সমস্যা পরিলক্ষিত হয় তা হলো-
- চর এলাকার কৃষির উন্নয়ন বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক কারণে বাধাগ্রস্থ হয়।
- দেখা গেছে যে, লবণাক্ততার পরিমান বাড়তে থাকলে বাধা সৃষ্টি হয়। শুকনো মৌসুমে মাটির লবণাক্ততা
সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। বিভিন্ন স্তরে লবণাক্ততা বিভিন্ন ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ে বিশেষ করে ফসলের ওপর প্রভাব ফেলে। জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ লবণাক্ত পানি দ্বারা প্লাবিত হয়। এই এলাকার শস্য উৎপাদনের সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ নেই। - সেচের অভাবে শুকনো মৌসুমে বোরো ধান, রবি শস্য এবং খরিপ-১ মৌসুমে আউশ ধানের চাষাবাদ কমে যায়।
- পরিবর্তনশীল জলবায়ু, বৃষ্টিপাতের তারতম্য, অসময়ে বন্যা এবং খরার প্রাদুর্ভাব আউশ ও আমন ধানের চাষাবাদ কমিয়ে আনে। অনিশ্চিত বৃষ্টিপাত বপন সময় পিছিয়ে দেয় এবং বন্যা আউশ ও আমন ধানের ফলন নষ্ট করে। অতিরিক্ত মৌসুমী বৃষ্টিপাতের কারণে আমন ধানের বপন সময় পিছিয়ে যায়। কখনো কখনো অতিবন্যা মাঠের ফসল তলিয়ে দেয়।
- চরাঞ্চলে সময়মত রবিশস্য বপন অত্যন্ত জরুরী কিন্তু দেরিতে আমন কাটার জন্য তা বাধাগ্রস্থ হয়।
- সারাবছর ১মিটার গভীরতার মধ্যে লবনপানির উপস্থিতির কারণে ফসল উৎপাদনে বাধাগ্রস্থ হয়।
- উপকূলে ভূমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সমুদ্র গর্ভে থাকে যার কারণে জমিতে লবণাক্ততার পরিমান কমে না যা উচ্চ ফলনশীল আউশ ও আমন ধান চাষে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।
- অধিকাংশ লবণাক্ত মাটির বুনট পলিমাটি, কাদা মাটি ধরণের। তাই শুকনো মৌসুমে জমি তৈরি করা খুব কষ্টসাধ্য। উপরের মাটি ঝুরঝুরে ও নীচের মাটি খুব শক্ত হয়ে যায়। তাই দ্রুত গভীরভাবে জমি কর্ষন করা দরকার।
- পানি নিষ্কাশনের সু বন্দোবস্ত না থাকায় সারা বছর জলাবদ্ধতা এবং ত্র“টিপূর্ণ স্লুইস গেটের কারণে উপক‚লীয় অঞ্চলে চাষাবাদ করা কষ্টকর ব্যাপার।
- লাগসই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের অভাব। এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ স¤প্রসারণ কর্মীরও অভাব।
- জমির ভোগ দখল ও প্রান্তিক চাষীর অভাব এ এলাকায় একটি বড় সমস্যা।
- বিনিয়োগ, অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাজারাজাতকরণ এই এলাকার কৃষি উন্নয়নের অন্তরায়।
- ভালো বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপর জ্ঞানের অভাব।
- কৃষকের সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার না করায় কাঙ্খিত ফলন কম হয়।
- উচ্চমূল্যের জন্য ইউরিয়া সার ছাড়া অন্যান্য সার ব্যবহারের কৃষকের অনীহা।
- কৃষি যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্য।
- লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের অভাব।
- সেচ খরচ বেশি।
- লবণাক্ততা দূরীকরণে বাস্তবমূখী কর্ম পরিকল্পনা না থাকা।
- ভরাট হয়ে যাওয়া খাল/নদী সংস্কার না করা।

সম্ভাবনা ও উপযোগী প্রযুক্তি-
উপক‚লীয় চরাঞ্চলে রবি মৌসুমের অনেক জায়গা অনাবাদী থাকে। কৃষকেরা দেশিজাতের রোপা আমন ধান চাষ করে বিধায় দেরীতে ফসল কর্তন হয় যার ফলে জমিতে জো আসার পর রবি ফসলের মৌসুম থাকে না। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় বিধায় রবি ফসলের চাষ করা যায় না। তাছাড়া ব্যবহার উপযোগী পানির তীব্র অভাব থাকায় ফসলের আবাদ করা সম্ভব হয় না। যদি মিঠা পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায় এবং তার সাথে সাথে স্বল্প মেয়াদী আমন ধানের জাত চাষ করা যায় তাহলে চরাঞ্চলে ব্যাপক অনাবাদী জমি রবি মওসুমে চাষের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। যা দেশের খাদ্য শস্য উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগ নোয়াখালীর চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও ফসল উৎপাদনে বেশ কিছু উপযোগী/লাগসই প্রযুক্তি গবেষণার মাধ্যমে বের করে এনেছে। যা লবণাক্ত এলাকার ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
- বসত বাড়িতে বছরব্যাপী সব্জী উৎপাদন।
- মালচ্ ব্যবহার করে আলু উৎপাদন।
- মালচ্ ব্যবহার করে টমেটো উৎপাদন।
- মরিচের সাথে পেঁয়াজের আন্তঃফসল।
- বাদামের সাথে মুগের আন্তঃফসল।
- সয়াবিনের সাথে কাউনের আন্তঃফসল।
- স্বল্প চাষে গম উৎপাদন।
- জীবানু সার দিয়ে সয়াবিনের চাষ।
- সেক্স ফেরোমনের সাহায্যে তরমুজের মাছি পোকা দমন।
- বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে সমন্বিত পুষ্টি উপাদানের ব্যবস্থাপনা।
- গ্রীস্মকালীন টমেটো উৎপাদন প্রযুক্তি।
- আউশ-আমন পতিত ও পতিত-আমন-পতিত শস্য বিন্যাসে স্বল্প মেয়াদী বাদাম ও সয়াবিনের জাত ব্যবহার করে নতুন শস্য বিন্যাস।
সুপারিশ-
১। কৃষক পর্যায়ে সকল ফসলের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম বৃদ্ধি করা।
২। লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন করা।
৩। ভূ-উপরিভাগের পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য জলাধার নির্মাণ করা।৪। পানি নিষ্কাশনের সু ব্যবস্থা করা।
৫। বিভিন্ন ফসলের সঠিক সময় বপন, রোপন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, পরিচর্যা সম্পর্কে ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী গ্রহণ করা।
৬। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
৭। খাল নদী পুনঃখনন করা।
৮। জমির উর্বরতা রক্ষা এবং লবণাক্ততা হ্রাসকল্পে জৈব সার উৎপাদন ও প্রয়োগে চাষী পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
৯। চরাঞ্চলের উপযোগী গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি স¤প্রসারণ জোরদারকরণ।
সর্বোপরি সমাজের সর্বস্তরের জনগণ, নীতি নির্ধারক, কৃষি বিজ্ঞানী, স¤প্রসারণবিদ ও জাতীয় বীর কৃষকদের সম্মিলিত প্রয়াসে নিশ্চিত হবে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য। আর নোয়াখালী হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম খাদ্য জোগানদাতা জেলা।
- লেখক
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট, নোয়াখালী।






