প্রত্যাশার ২০১০ : আমাদের আত্মার শান্তি হোক
-খালেদা আক্তার লাবণী-
নানা জনের কথায় নানা ভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বার বার আলোচিত হয়েছে। চলতি সময়ের নিয়ম মেনেই আমরা যুদ্ধের কথা বলছি এবং আসছে দিনেও অনেকবার করে বলব। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র অথবা বিশ্বাসের ভিত্তি যাই বলি না কেন যেকোন কোন থেকে যেকোন আলোচনা একটি চক্রে আবর্তিত হয়।11ঘটনার পারষ্পারিকতা, বৃহত্তর, শ্রেণীর অংশগ্রহণ, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এজন্য দায়ী। এই নিয়ম মেনেই যেন আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধ পুরুষ যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ দ্বারা বিবেচিত হয় বেশী। যোদ্ধার কথা ভাবলেই, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ালেই একজন যোদ্ধার চিত্র আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। যেমন মিছিলের কথা ভাবলেই মনে পড়ে একসারি মানুষের মুখ, যাদের বেশীর ভাগই পুরুষ।
কোন ধরনের পুরুষ বিদ্বেষ অথবা অতিমাত্রায় নারীবাদীর প্রবণতার কথা মাথায় রেখে এই লেখাটি শুরু করিনি। আমি একদম নিরপে চিন্তার জায়গায় থেকে বলার চেষ্টা করছি। যখন বাবার মুখে যুদ্ধের গল্প শুনেছি তখন আমি নিজেও আমার বাবা ও তার বন্ধুদের কথাই দৃশ্যপটে এঁকেছি। আমার মা- যে ৭ই মার্চ ভাষণে যোগদান করতে ছোটা গ্রামবাসীদের জন্য, যুদ্ধকালীন সময়ে যোদ্ধাদের জন্য রুটি গড়ে দিয়েছিল নিজের হাতে- তার কথা একবার মনেও করিনি। একমাত্র পুত্র সন্তানটিকে বুকে জড়িয়ে আমার কম বয়সী মা যে মানসিক যন্ত্রণা প্রতিনিয়ত ভোগ করেছিলেন সে সময়- তাও আলাদা করে অনুভব করিনি। বরং বাবার গর্বেই যেন অনেক বেশী গর্বিত বোধ করেছি।
আমরা আলোচনার গোল চত্বরে সবসময় এভাবেই যোদ্ধাদের চিত্রপট এঁকে চলেছি। কেন জানি যুদ্ধের সময়ে মানসিক শান্তি, শারীরিক সম্ভ্রম বিসর্জন দেয়া অসংখ্য যোদ্ধা নারীর কথা আমাদের কন্ঠস্বর থেকে উহ্য থেকে যায়। আমরা “অসংখ্য মা বোন এর সম্ভ্রম এর বিনিময়ে.........................” এই কোটেশনটি ব্যবহার করেই আলোচনার দাঁড়ি টানি। “তারা” “তাদের” “বীর যোদ্ধাদের” ইত্যাদি সর্বনাম ধরে সব ধরনের বক্তব্য জন সম্মুখে নিয়ে আসি । শব্দটি উচ্চারিত হয় কেবল শ্রদ্ধার শুকনো ফুল হিসেবে।
এইসব “অঙ্গনা”রা - যাদের আমরা “বীর” হিসেবে যুক্ত শব্দে উচ্চারণ করি, তাদেরকে আমরা বীর হিসেবে আমাদের মনে আদৌ ঠাঁই দিয়েছি কি? বীরঙ্গনা শব্দটি দ্বারা আমরা কি কেবল “একাত্তরে ধর্ষিতা নারী” এই চিন্তাই ধারন করছি না? মেয়েকে ধর্ষণ এর ঘটনা মনে করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এক মায়ের গল্প আমি পড়েছি। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে এরকম অনেক মাকে খুঁজে পাব। কিন্তু কতজন এই মায়ের দুঃখটুকু শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে পারছি! কতজন এ মায়ের কথা মনে করে অসংখ্য দুঃখজয়ী মাকে সম্মান করে নারীদের সম্মান করতে শুরু করেছি! জানা এবং মানার মধ্যে সবসময়ই শুভংকরের ফাঁকি রয়ে যাচ্ছে।
আমাদের সবার কাছে আমরা একাত্তর এর নারীদের দুঃসহ ম্মৃতি থেকে কতদূর সম্মান করছি তাদেরকে? একাত্তর নারীদের আত্মত্যাগ আমাদের কতটুকু সহনশীল করেছে নারীদের প্রতি! প্রতিদিনকার রাস্তায় চলার অভিজ্ঞতায় দেখি প্রগতিশীল সমাজের কথা বলার জায়গা অথবা গলির মোড়ের চা দোকান সব জায়গাতেই নারী কেবলই নারী। মানুষ নয়। কোন এক পণ্য মাত্র। উচ্ছল আনন্দময়ী আর আলোচনার অনেক বড় খোরাক। কখনও কোন নারী কোন অধিকারের প্রশ্ন তুললেই কটা অথবা বক্রোক্তি। দানের সীমার সর্বোচ্চে পৌছানো নারীরা যারা সত্যিকার মানুষের পরিচয় দিয়েছে ১৯৭১ সালে তাদের কথা মননের ধারণে আমাদের কত দ্বিধা!
যদি দ্বিধাবোধ নাই থাকল- তাহলে কি আত্মত্যাগের এত বছর পরও এ প্রসঙ্গ নতুন করে তুলতে হয়? নারীকে নারী নয় বরং মানুষ জাতীর সম্মানিত অংশ ভাবতে দৃষ্টি আর্কষণ করতে হয়? সভ্য সমাজ গড়ার যে প্রত্যাশা আমরা সবসময় করি- মানুষ মানুষ না হলে কি তা কোনদিন সত্যি হবে? মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠিত না হলে তা কোনদিনও সম্ভব নয়। মৌখিক প্রত্যাশায় সমতার দাবী আর অন্তরে সুবিধাভোগের সর্বোচ্চ চেষ্টা লালন করলে কেউ কোনদিনই সফল হবে না।
শিক্ষিত সমাজের উদাহরণে সকল সুশীল সমাজ অনুপ্রাণিত হয়। শিখতে চাই। তাতেই প্রকৃত মুক্তি সম্ভব। সেজন্য প্রয়োজন আত্মত্যাগের কথা চিন্তা, কথা ও কাজে ধারণ করা। নতুন সময়ে এই প্রত্যাশাই থাকুক। নতুবা আসুন- আমরা আমাদের আত্মার শান্তি কামনা করি।
lkhaleda@yahoo.com