
রুদ্র মাসুদ-
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততা এবং সেচ সংকটের কারণে প্রতিবছর নোয়াখালীতে বাড়ছে অনাবাদি জমির পরিমান। যার ধারাবাহিকতায় চলতি বোরো মওসুমেও নোয়াখালীতে অনাবাদি থাকছে প্রায় ৭৯ হাজার হেক্টর জমি। যারফলে হাত ছাড়া হবে বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী আট’শ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন। কৃষক, কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞ সবাই একবাক্যে এ চিত্র স্বীকার করে নিলেও এ বিপুল পরিমান অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কোন পদপে নেয়া হচ্ছে না। ফলে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের নানা কর্মসূচী নোয়াখালীর কৃষকদের জন্য ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে।
একইভাবে খাল-বিল দখল ও সংস্কার না করার কারণে পর্যন্ত পানি ধরে রাখতে না পারায় আবাদী জমিতেও সেচ সংকট নিয়ে চিন্তিত কৃষকরা। পাশাপাশি আমন মওসুমে জলাবদ্ধতার কারনেও বিপুল পরিমান জমি অনাবাধি থাকায় সরকার ঘোষিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে নোয়াখালীর কৃষি উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জনপ্রতিনিধি ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সুত্রে জানা যায়, নোয়াখালীতে নীট ফসলী জমির পরিমান ২ লাখ ২ হাজার ৯৬৬ হেক্টর। তন্মধ্যে চলতি বোরো মওসুমে আবাদের ল্যমাত্র ধরা হয়েছে মাত্র ৫৯ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমি। এছাড়া রবিসহ অন্যান্য ফসল আবাদের ল্যমাত্র ধরা হয়েছে ৬৪ হাজার ৭৮২ হেক্টর জমিতে। বোরের ক্ষেত্রে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা গড়ে ৪ দশমিক ৩ মেট্রিক টন (চাউলের হিসাবে) ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রার হিসাবে চলতি মওসুমে জেলায় অনাবাদি থাকবে ৭৮ হাজার ৮০১ হেক্টর জমি। যার বেশিরভাগই সদর, সুবর্নচর এবং হাতিয়া উপজেলায়। এ জমিতে শুধু বোরো আবাদ করা গেলে আরো ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৫ মেট্রিক টন খাদ্য (চাউল) উৎপাদন করা যেতো (উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪ দশমিক ৩০ মেঃটন অনুযায়ী)। বর্তমান বাজার মূল্য (মোটা চাউল ২৪ হাজার টাকা টন) অনুযায়ী কৃষকের হাতছাড়া হবে
৮’শ ১৩ কোটি টাকার বেশি।সুত্র মতে, এ অনাবাদি জমিতে শুধুমাত্র ধান আবাদ না করা না গেলে রবি ফসল আবাদ করলে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় চীনাবাদা, সয়াবিন, মুগ, খেসারী, ফেলন, মরিচ, তরমুজ, গ্রীস্মকালীন সব্জী আবাদে ইতোমধ্যে ব্যাপক ফলন পাওয়া গেছে।
পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় বিপুল পরিমান খাস জমি থাকলেও এ অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় এবং লবণাক্ততা সহায়কসহ বিভিন্ন জাতের বীজ উৎপাদনের জন্য বিএডিসি কর্তৃক বীজ উদ্যান তৈরীর জন্য ৫’শ একর জায়গা বরাদ্দের জন্য দাখিল করা প্রকল্পও ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে এ অঞ্চলের জমির উপযোগী বীজ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা।
জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতি বছর কমছে আবাদি জমি-
এদিকে নোয়াখালী খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা হলেও এক হিসাবে দেখা গেছে প্রতিবছর বোরো ও রবি মওসুমে আবাদি জমির পরিমান কমছে। শুধুমাত্র গত বোরো মওসুমের তুলনায় চলতি মওসুমে আবাদি জমি কমেছে ১৪ হাজার হেক্টর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শীতকালে বৃষ্টির পরিমান কমে যাওয়া, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় এলাকার জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সেচের জন্য পযাপ্ত ভূ-উপরিস্থ পানি ধরে রাখতে না পারা এবং ছোট-বড় খালগুলো দখল এবং শুকিয়ে যাবার কারণেই এই বিপর্যয় বলে দাবি কৃষি বিশেষজ্ঞদের।
কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউট সুত্রে জানা যায়, নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ কৃষি জমি রয়েছে উপকূলীয় চরাঞ্চলে। বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানে মার্চ-এপ্রিল মাসে এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এক দশমিক এক থেকে এক দশমিক ছয় ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেছে। একই সাথে শীতাকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিপরীতে বৃষ্টিপাত কমেছে ১৯ শতাংশ হারে। পাশাপাশি শীতকালে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে।
নোয়াখালী উপকূলীয় এলাকায় এ ধারা ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। যা জেলার কৃষির জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এক নিবন্ধে লবণাক্ততা সহায়ক জাত উদ্বাবন, ভূ-উপরিভাগের পানি সংরক্ষন ও সরবরাহের জন্য জলাধার নির্মাণ, পানি নিস্কাষন, খাল-নদী পুনঃখননসহ নয় দফা সুপারিশ করেছেন কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউট নোয়াখালী’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এম আমিন।
আবাদী জমির সেচ সংকট-
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সেচ সংকটের কারণে শুধুমাত্র অনাবাদি জমির পরিমাণই বাড়ছে না সংকটে রয়েছে বোরো আবাদকারী কৃষকরাও। জমিতে যেটুকু পানি রয়েছে তা দিয়ে ধানের চারা রোপন কলেও পরবর্তীতে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি প্রাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। একই সমস্যা বিরাজ করছে জেলার বিদ্যুৎ নির্ভর সেচ এলাকাগুলোতে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়েন সেনবাগ ও চাটখিল উপজেলার বিদ্যুতের সেচ গ্রাহকেরা। গত কয়েক বছরই এই দুইটি উপজেলার কৃষকেরা ঠিকমত বিদ্যুৎ না পেয়ে বোরো ফসল নিয়ে দারূন সংকটের মধ্যে পড়েন।
সদর উপজেলার শিবপুর গ্রামে বর্গা জমিতে ধানের চারা রোপন করতে করতে কৃষক সামছুল হক জানালেন, যেটুকু পানি জমিতে আছে তাতে চারাতো লাগাচ্ছি, কিন্তু পরবর্তীতে সেচের জন্য পানির পেতে ভোগান্তির শেষ থাকবে না।
একই কথা জেলার সর্বাধিক বরো আবাদী উপজেলা বেগমগঞ্জের আমান উল্যা পুরের জয়নাল, দূর্গাপুরের শেখ আহম্মদ, রফিকপুরের কৃষক মফিজ উল্লার কন্ঠেও। তাঁদের মতে ৮-১০ বছর আগেও বোরোর সেচ নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তায় পড়তে হতোনা । জমির পানি শুকিয়ে গেলে খালে জমানো পানি দিয়ে সেচ দিতেন। কিন্তু খালে পানি সংরনের উদ্যোগ না থাকায় এবং খালগুলো ভরাট এবং বেদখল হয়ে যাওয়ায় এখন পানি আর আগের মত থাকেনা। কৃষকরা ব্যক্তি উদ্যোগে খালে বাঁধ দিয়ে যেটুকু পানি ধরে রাখতে পারছে তাই সম্বল। ঠিক মত সেচ দিতে না পারায় ভাল ফলন পাননা।
এনিয়ে আমান উল্যা পুরের ইউপি সদস্য আবু তাহের জানান, অক্টোবর মাসের শেষ অথব নভেম্বরের প্রথমে আগে চন্দ্রঞ্জের পূর্বপাশ্বে মহেন্দ্র খালে আড়াআড়ি বাঁধ দেয়া হতো যার ফলে খালের পানি দিয়ে কৃষকরা বেগমগঞ্জের কৃষকরা কিছুটা হলেও উপকৃত হতো। কিন্তু গত দুই বছর ধরে এই বাঁধও দেয়া হয়না। পাশাপাশি চন্দ্রগঞ্জে রাবারড্যাম নির্মাণেরও কোন সুরাহা হয়নি।
এদিকে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মানজারুল মান্নান জানালেন, আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণের জন্য কোন বরাদ্দ তাদের কাছে না থাকায় সময়মতো বাঁধ দেয়া যায়নি।
একটু আলোর ঝিলিক-
গত অক্টোবরে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী নোয়াখালী সফর শেষে জলাবদ্ধতা নিরসন ও সেচ সংকট দূরীকরণে বিএডিসির মাধ্যমে ৬ কোটি ২৪ ল টাকা ব্যায়ে নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর জেলা ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের আওতায় খাল খনন, পাম্প বসানোসহ বিভিন্ন অবকাঠানো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পকে বর্ধিত আকারে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি কৃষকদের।
নোয়াখালীর কৃষি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কৃষিবিদ ড. সঞ্জয় কুমার অধিকারী বিএডিসির সাধ্যমে বীজ উৎপাদন খামার তৈরী, ভালো
বীজ উৎপাদন ও সংরণের জন্য কৃষকদের প্রশিণ, লবণাক্ততা সহনীয় এবং লবণাক্ততা এড়িয়ে যেতে পারে এমন জাতের উদ্ভাবনের পাশাপাশি কৃষি, মৎস, পশু সম্পদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কৃষির সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত পক্ষসমূহের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন চলমান নোয়াখালীর সাথে আলাপচারিতায়।এদিকে বোরো মওসুমের পাশাপাশি আমন মওসুমেও বিপুল পরিমান জমি অনাবাদি থাকার কথা উল্লেখ করে উন্নয়ন গবেষণ নুরুল আলম মাসুদ সরকার ঘোষিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় নোয়াখালীর কৃষি উন্নয়নের দাবি জানান।
নোয়াখালীর বিপুল পরিমাণ জামি অনাবাদি থাকা এবং কৃষির উন্নয়নের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নোয়াখালী-৪ (সদর-সুনর্বচর) আসনের সরকারি দলের সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী জানান, বিএডিসির মাধ্যমে বীজ উদ্যান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। জলবায়ূ পরিবর্তণের সাথে খাপখাওয়ানোর বিষয়টি মাথায় রেখে একটি সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় কিভাবে কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো যায় সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।




