-রুদ্র মাসুদ-
ক’বছর ধরে তিন মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসাবে আমাদের দেশে পালিত হচ্ছে। উপকূলী জেলা
নোয়াখালীতেও বেশ ঘটা করে পালিত হয় দিবসটি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এই দিনে গণমাধ্যমকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মধ্যদিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ ও সংবাদ পরিবেশনের অবাদ সুযোগের বিষয়টি রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরার কথা। কিন্তু সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের একটি অংশ সেই পেশাগত দাবি এবং জনবান্ধব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতেই মরিয়া হয়ে উঠে। যা সমাজের অন্যান্য অনুষঙ্গের মতো সাংবাদিকতাকেও কলুষিত করে। গত ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করায় বিটিআরসি চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়ার পর আমরা দেখেছি সেখানকার সাংবাদিক ও কলাকুশলীদের কান্না। চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে যেভাবে ফলাও প্রচার পেয়েছে সেখানকার সাংবাদিকদের অনিশ্চিত আগামির বিষয়টির সেভাবে প্রচার পায়নি। আমাদের সাংবাদিক নেতৃত্বও বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন বলে একজন মফস্বল সংবাদকর্মী হিসাবে বারবার মনে হয়েছে। এটি কেনো ? আগামিতে কোন মিডিয়া হাউজ যে বন্ধ হবে না এরকম নিশ্চয়তা কে দিবে ? তাহলে সাংবাদিকদের পেশাগত নিশ্চয়তা কোথায় ?এবারের মুক্ত সাংবাদিকতা দিবসকে সামনে রেখে কতগুলো বিষয় নিজের মধ্যে ভাবনার জট তৈরী করেছে। কারণ সাংবাদিকতায় পথচলা বেশিদুর না হলেও বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে সাংবাদিক নির্যাতন, হুমকি ও হামলার মতো নতুন কিছু উৎপাত সেই জট সৃষ্টির কারণ। আমরা যারা সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত তাদের সামনে প্রতি বছর এই দিনে ঘুরেফিরে একটি প্রশ্ন দাঁড়ায়- আমাদের গণমাধ্যম কতটুকু স্বাধীন? কতটুকু মুক্ত এর সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর কলম। কতটুকুই-বা পারছি গণমানুষের কথা বলতে। কোথায় বাধা, কারা বাধা তৈরি করছে? কিংবা কেন বাধা দিচ্ছে?
আমাদের দেশে প্রায়ই শোনা যায় গণমাধ্যম হচ্ছে নির্যাতিত নিপীড়িত তথা বঞ্চিত মানুষের শেষ ভরসাস্থল। কখনো কখনো একথাটি সত্য প্রমানিত হয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে এবিষয়টি শুধুমাত্র ক্ষমতাহীনের জন্য ক্ষমতাসীনের জন্য নয়। বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়ে এ বিষয়টি রীতিমতো দ্বন্ধ তৈরী করেছে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে যারা কোন অনিয়ম ও বঞ্চনার ঘটনায় সংবাদকর্মীদের কাছে বারবার ছুটে এসেছে তারাই এখন নানাভাবে সাংবাদিকদের ওপর খবরদারি করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। ক্ষমতাসীন জোটের ছাত্র ও যুব নেতাকর্মীরা যখনই কোন ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন তখনই নানা ছলছাতুরীর আশ্রয় নিয়ে আবদারের সাথে তাদের ‘বিষয়টি’ দেখার জন্য অনুরোধ করছেন। বিপরীতদিকে যারা বিগত জোট সরকারের সময়ে বলেছেন সাংবাদিকরা মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে বাড়াবাড়ি করে তারা এখন বলছেন সাংবাদিকরাই পারে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে। এই বৈপরীত্যের মাঝে একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতায় একধরণের সেন্সরশিপের আওতায় পড়ে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে।
উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছি-বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যথারীতি বন্ধ হয়নি সাংবাদিক নির্যাতন। গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি ক্ষমতাসীনদলের এমপি, মন্ত্রী এমনকি মাঠ পর্যায়ের নেতাদের রোষানলের বিষয়টি প্রায়ই সংবাদ হিসাবে উঠে আসছে। গতবছরের ১১ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের গাফরগাঁওয়ে স্থানীয় সাংসদ ক্যাপ্টেন (অবঃ) গিয়াস উদ্দিন আহমেদের ক্যাডাররা সমকাল প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল আমীন বিপ্লবকে কুপিয়ে জখম করার বিষয়টি। এরপর সারাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়গুলো পাঠক মাত্রই জেনেছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার আমিশাপাড়ায় যুবলীগকর্মী খুনের ঘটনার সংবাদ কভার করতে গিয়ে আমি নিজে এবং প্রথম আলো, যুগান্তর, ভোরের ডাক ও ইসলামী টেলিভিশনের প্রতিনিধি হামলার শিকার হয়েছিলাম। পুলিশের উপস্থিতিতেই যুবলীগ ক্যাডাররা যখন আমাদের ওপর চড়াও হয় তখন বরবার মনে হচ্ছিলো এ কোন দেশে বসবাস করছি। ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন ও আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ দুঃখ প্রকাশ করেছেন ঠিকই কিন্তু কর্মীদের সংযত করতে পারেননি নেতারা। এর কিছুদিনপরই জেলা শহরে ঘটেছে আমারদেশ প্রতিনিধি ও স্থানীয় দৈনিক দিশারীর সম্পাদকের ওপর হামলার ঘটনা। এসবই ঘটেছে ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে। তাহলে সংবাদকর্মীরা কি করবে ? সংবাদ সংগ্রহ এবং পরিবেশন বন্ধ রাখবে ? নাকিআমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তরিক হবে। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বিষয়গুলো বারবার মনের গহীনে উঁকি দিচ্ছে প্রশ্ন আকারে। এই প্রশ্নের উত্তর নয় চাই মুক্ত পরিবেশে সাংবাদিকতার।
সূচনাতে একটা বিষয় উল্লেখ করেছি- তা হলো জনবান্ধব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা এবং সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের বিষয়টি। গণমাধ্যমে শুধু নেতিবাচক কিংবা চলমান ঘটনাই বেশি প্রাধান্য পায় জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে। এই বৃত্ত থেকেও গণমাধ্যমকর্মীদের বেরিয়ে আসার আহবান জানাবো। কারণ একজন সংবাদকর্মী হিসাবে উন্নয়ন- সম্ভাবনা কিংবা শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে নেয়া এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কল্যাণে আগামির সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় প্রান্তিক গণমাধ্যম কর্মীদের আরো ভূমিকা পালন করার আবেদন থাকবে। একই সাথে রাজনৈতিক লেজুড় পরিহার করে সাংবাদিক নির্যাতন, হত্যা, নিপীড়ন কিংবা চাকরী হারানের মতো অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিকদের ঐকব্যদ্ধ অবস্থানকে সুদৃড় করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়শ্চয়তায় সরকার তথা রাষ্ট্র আরো বেশি আন্তরিক হবে এমটি প্রত্যাশা করবো।
সবশেষে- সারাদেশে প্রান্তিক পর্যায়ে কর্মরত প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহবান থাকবে রাজনৈতিক লেজুড় পরিহার করে সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে একাতাবদ্ধ হতে হবে। কর্মেক্ষেত্রে একজন গণমাধ্যমকর্মীরা স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা না থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও আরাধ্য থেকে যাবে।






